বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নে ৩৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ২০১৫ সালের জুলাইয়ে। গত পাঁচ বছরে প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজও শেষ হয়েছে। এখন নতুন করে কিছু অঙ্গ (কম্পোনেন্ট) যুক্ত করে প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে বিদেশে শিক্ষা সফর বাবদ আলাদা বরাদ্দের আবদার করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর আগেও একবার প্রকল্পের সংশোধনী এনে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়িয়েছিল। নতুন করে আবার ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। যদিও এই বিদেশ ভ্রমণে বরাদ্দ দাবি নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ৩৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় এলজিইডি ‘বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা)’ শীর্ষক প্রকল্পটি পাস হয়। ওই সময় বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। পরে নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে ২০১৮ সালে ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে ৪০৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায় এবং মেয়াদ ধরা হয় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় হয়েছে ২৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬৮ দশমিক ৩২ শতাংশ ও বাস্তব অগ্রগতি ৬৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। নতুন করে এ প্রকল্পটির আরও ৪০ কোটি টাকার ব্যয় ও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে ৭০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে বিদেশে শিক্ষা সফর বাবদ। পরামর্শক ফি বাবদও চাওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, সর্বশেষ অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) বৈদেশিক শিক্ষা সফরের সংস্থান ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে এ খাতে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় বাস্তবায়নকারী সংস্থার (এলজিইডি) যথেষ্ট সামর্থ্য ও সক্ষমতা রয়েছে। এ জন্য বৈদেশিক শিক্ষা সফর অপ্রয়োজনীয়।
পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান করোনা পরিস্থিতির ফলে অহেতুক বৈদেশিক সফরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি যেন না হয় সে জন্য চলমান বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্পগুলোকেও তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এই তিন ক্যাটাগরির মধ্যে নিম্ন অগ্রাধিকার প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রেখেছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা ও সরকারের সতর্কতায়ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় প্রকল্পে বৈদেশিক সফরের জায়গা থেকে সরে আসেনি। এমনই হয়েছে আলোচ্য প্রকল্পে। প্রস্তাবে শিক্ষা সফরের আবদার করা হয়েছে। তবে কতজন কর্মকর্তা বিদেশে শিক্ষা সফরে যাবেন, সে বিষয়ে সংশোধিত ডিপিপিতে কোনো কিছু উল্লেখ করেনি সংশ্লিষ্টরা। শুধু বৈদেশিক শিক্ষা সফর বাবদ ৭০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন প্রশ্ন তুলেছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশ ভ্রমণসহ অহেতুক প্রকল্প ব্যয় কমানোর কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্প রয়েছে যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ২২ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেন শিক্ষা সফরের নামে। থাকেন এক দিন বা আরও অল্প সময়। এসব সফর প্রকল্পের জন্য সুফল বয়ে আনে না; বরং জনগণের টাকার অপচয় হয়। প্রকল্পের আওতায় বিদেশ ভ্রমণ বা শিক্ষা সফরের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা ছাড়া প্রকল্পের আওতায় আর বিদেশ ভ্রমণ চলবে না।’
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পে পরামর্শকের সংখ্যা বাড়েনি। কিন্তু এ খাতে ৫৩ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অসংগতিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা যথাযথভাবে প্রণয়ন করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে কমিশন জানিয়েছে, একাধিক ক্রয় পদ্ধতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট ক্রয় পদ্ধতি নির্ধারণ এবং আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ, আদেশ অনুযায়ী ক্রয়চুক্তি অনুমোদনকারী কর্র্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্পের যেসব আইটেমের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর যৌক্তিকতার ব্যাখ্যা দিতে হবে। অন্যদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় পর্যালোচনা করে যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া ইউনিয়ন সড়কে ৩৮ মিটার ব্রিজ নির্মাণ নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। একান্ত অপরিহার্য না হলে আর্থিক বিবেচনায় এ অংশটি বাদ দিতে হবে।
প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের মাধ্যমে পল্লী সড়ক ও সড়কে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। এ ছাড়া হাটবাজার বা গ্রোথ সেন্টারের ভৌত সুবিধাদি উন্নয়নের কার্যক্রম রয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ভৌত নির্মাণকাজের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।