করোনা মহামারী আবার দেখা দিলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরকারি অর্থ খরচ করার বিষয়ে সর্বোচ্চ মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে। ঠিক যেটুকু আমাদের নেহাত প্রয়োজন তার বেশি এখন কোনো পয়সা খরচ করা চলবে না।’ গতকাল রবিবার সেনাবাহিনীর ১০টি ইউনিটকে জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাভার ক্যান্টনমেন্টে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
কভিড-১৯-এর সংকটময় সময়েও মানুষের কল্যাণে বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। যেটা দেওয়া খুব কঠিন ছিল। তবু আমরা দিয়েছি এবং বলেছি যে অর্থ খরচের ব্যাপারে সবাইকে একটু সচেতন থাকতে হবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২ হাজার ডাক্তার ও ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী সংগঠনও অসহায় মানুষকে এই কভিড-১৯ মহামারীতে সাহায্য করে যাচ্ছে। করোনাকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে ২১টি প্যাকেজে প্রণোদনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এতে ১০ মিলিয়নের বেশি পরিবার উপকৃত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুরসহ ৫ মিলিয়ন মানুষকে নগদ অর্থসহায়তা দিয়েছি।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘মানুষকে আবার আমাদের সহযোগিতা করতে হবে, চিকিৎসা করতে হবে, ওষুধ কিনতে হবে, হয়তো আরও ডাক্তার-নার্স আমাদের লাগবে। সেদিকে লক্ষ রেখেই আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় দফায় করোনা মহামারী দেখা দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখনো করোনাভাইরাসের প্রভাব আছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আরেকবার হয়তো এই করোনাভাইরাসের প্রভাব বা প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। কারণ ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আবার নতুন করে দেখা দিচ্ছে। আমাদের এখন থেকেই সবাইকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। সেই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। আপনারা এ ব্যাপারে যার যার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।’
খাদ্য উৎপাদন আরও বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কৃষিতে আমার নির্দেশনা ছিল প্রচুর পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। কোনো মতে যাতে খাদ্যসংকট দেখা না দেয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী একটা খাদ্য মন্দা দেখা দিচ্ছে। অনেক উন্নত দেশও হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা সঠিক সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিলাম বলেই আজকে সেই সমস্যাটা আমাদের দেখা দিচ্ছে না।’
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ১০টি ইউনিটের সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের কাছে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকাপ্রাপ্ত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা এই গৌরব অর্জন করেছেন এবং আমি আশা করি জাতির আস্থা ও বিশ্বাস অটুট রেখে দেশসেবায় আপনারা আত্মনিয়োগ করবেন। কারণ দেশমাতৃকার সেবা করতে পারাটাই সব থেকে বেশি গৌরবের। আমার পক্ষ থেকে এই পতাকা সেনাবাহিনীপ্রধান আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমি পারলাম না, এটা আমার দুর্ভাগ্য।’
বিশ^ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হবে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী এখন শুধু দেশেই নয়; বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য হিসেবে বিশ^ শান্তি প্রতিষ্ঠাতেও অবদান রেখে যাচ্ছে। আমি সব সময় চেয়েছি আমাদের সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনী যেন আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন এবং আধুনিক শিক্ষায় সুপ্রশিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে পারে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সব সময় নিবেদিতপ্রাণ। সে জন্য জাতিসংঘ যখনই আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য চেয়েছে, পুলিশ বাহিনী চেয়েছে আমরা সেটা দিয়ে যাচ্ছি, শুধু আমরা যেহেতু বিশ্ব শান্তিতে বিশ্বাস করি।’
করোনা মোকাবিলায় আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এই করোনাভাইরাসেও আমাদের সেনাবাহিনী দীর্ঘ কয়েক মাস ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা, তাদের মধ্যে রিলিফ বিতরণ করা, তাদের নানা ধরনের সহযোগিতা করা, করোনা সম্পর্কে তাদের সচেতনতা সব ব্যাপারেই বিশেষ ভূমিকা আপনারা পালন করে যাচ্ছেন।’ প্রধানমন্ত্রী সে জন্য সেনাবাহিনীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীর সদস্যদেরও ধন্যবাদ জানান।
সেনাসদস্যদের পেশাগতভাবে দক্ষতার পাশাপাশি সৎ জীবন যাপনের তাগিদ দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশের সম্পদ এবং মানুষের ভরসা ও বিশ্বাসের প্রতীক। কোনো সেনাবাহিনী যদি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে না পারে তাহলে কখনো তারা কোনো বিজয় অর্জন করতে পারে না। তাই আপনাদের সবাইকে পেশাগতভাবে দক্ষ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎ এবং মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে। দেশপ্রেম ও সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রেখেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
ভিটিসিতে সেনাবাহিনীকে জাতীয় পতাকা প্রদান করেছেন শেখ হাসিনা : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯টি ইউনিট ও একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সকালে সাভার সেনানিবাসে নবম পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে কোর অব মিলিটারি পুলিশ সেন্টার অ্যান্ড স্কুলমাঠে প্যারেডে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী। পরে অনুমতি নিয়ে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) প্রদান করেন।
জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) প্রদান প্যারেড শেষে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এ সেনাবাহিনীকে আধুনিক সাজসজ্জায় সজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। দেশ গঠন, বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলা ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ ও অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করেন। এছাড়া ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রাপ্ত ৯টি ইউনিট ও একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তাদের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারা অব্যাহত রেখে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাবে এবং সেনাবাহিনীর চৌকস ইউনিট হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত ও সুদৃঢ় করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ইউনিট প্রধানদের জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রাপ্ত ৯টি ইউনিট ও একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের অংশগ্রহণে দৃষ্টিনন্দন প্যারেড উপভোগ করেন। এসময় ওই অনুষ্ঠানে নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন ও ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।