যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এনবিসি নিউজ ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের সর্বশেষ জরিপ বলছে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে বাইডেন জাতীয়ভাবে ১৪ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। তবে গত রবিবার জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত জরিপ বা সমীক্ষার বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে, ট্রাম্পের চেয়ে বাইডেন এগিয়ে আছেন ১০ পয়েন্ট। ওই বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে গত ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেনের প্রতি সমর্থন আছে ৫২ শতাংশ মানুষের। আর রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন ৪২ শতাংশ মানুষ।
ব্যক্তিগত জরিপের ভিত্তিতে করা গড় ট্রেন্ড লাইনে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা বাড়লেও গত ২ অক্টোবর তার করোনা ধরা পড়লে ফের ভাটা পড়তে শুরু করে তার জনপ্রিয়তায়। গত ১০ তারিখ পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তার সূচক কিছুটা নিম্নমুখী। তবে বিবিসি এও বলছে, এই জরিপগুলো থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তবে নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে আগে থেকে আন্দাজ করা কঠিন। বিবিসি উদাহরণ হিসেবে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেছে। ওই নির্বাচনের আগে জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে তিনি ৩০ লাখ ভোট বেশিও পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি হেরে যান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ নির্বাচনী ব্যবস্থা ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতির কারণে এ রকম হয়েছে। ফলে বেশি ভোট পেলেই নির্বাচনে জয়ী হবেন সেটা সব সময় নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এ বছর জানুয়ারি মাস থেকে জাতীয় পর্যায়ে যত জরিপ হয়েছে তার বেশিরভাগ ফলাফলেই জো বাইডেন ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে এগিয়ে আছেন।
এনবিসি নিউজ ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের সর্বশেষ জরিপ বলছে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের এই প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর মধ্যে বাইডেন এখন জাতীয়ভাবে ১৪ পয়েন্টে এগিয়ে। গত ৪ অক্টোবর ওই জরিপের ফল প্রকাশিত হয়। তবে জরিপটি চালানো হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প-বাইডেনের প্রথম মুখোমুখি বিতর্কের মাত্র দুই দিনের মাথায়। তবে ২ অক্টোবর যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার খবর বেরোয়, তার আগেই এই জরিপ শেষ হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবরের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায় জো বাইডেনকে সমর্থন দিয়েছেন নিবন্ধিত ৫৩ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে ট্রাম্পের পক্ষে এমন ভোটার ৩৯ শতাংশ। এনবিসি নিউজ/ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের আগের জরিপটি চালানো হয়েছিল গত ২০ সেপ্টেম্বর। তখন ট্রাম্পের চেয়ে ৬ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন বাইডেন। এবার সেই পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ১৩। অতীতে কখনো বাইডেন এত বেশি পয়েন্ট পাননি। তার সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পাওয়ার রেকর্ড ছিল গত জুলাইয়ে। তখন ১১ পয়েন্টে এগিয়েছিলেন।
এদিকে গত রবিবার পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের জরিপগুলোর বিশ্লেষণ করে বিবিসি দেখিয়েছে, বাইডেনের প্রতি সমর্থন ৫২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে এগিয়ে আছেন ১১ পয়েন্টের বেশি। গত নির্বাচনের আগে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প কার অবস্থান কোথায় এই চিত্রটা ততটা পরিষ্কার ছিল না। তবে এবার দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশি। বিশেষ করে ফলাফল নির্ধারণ করা ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটস খ্যাত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বাইডেনের এগিয়ে থাকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গত নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের পরাজয় থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, কোন প্রার্থী কত বেশি ভোট পেয়েছেন তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোন রাজ্যে কোন প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছেন।
সাধারণত বেশিরভাগ রাজ্যেই সব সময় একই রকমের ভোট পড়ে। কিছু কিছু রাজ্য আছে যেখানে দুজন প্রার্থীর যেকেউ বিজয়ী হতে পারেন। এসব রাজ্যেই নির্ধারিত হবে কে নির্বাচনে জয়ী আর কে পরাজিত হবেন। জয়-পরাজয়ের যুদ্ধটা হয় সেখানেই আর তাই এসব রাজ্যকে বলা হয় ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটস। ১৪টি এমন রাজ্যের মধ্যে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প এগিয়ে আছেন মাত্র দুটি রাজ্যে। বাকিগুলোতে এগিয়ে আছেন বাইডেন।
এখনকার জরিপে ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্জিয়া ও টেক্সাসে এগিয়ে আছেন। এর মধ্যে টেক্সাসে ব্যবধান কিছুটা বেশি হলেও জর্জিয়ার ব্যবধান ১ পয়েন্টেরও কম। আর আইওয়াতে এক মাস আগেও ট্রাম্প এগিয়ে থাকলেও নতুন জরিপে সেখানে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি।
জো বাইডেন এগিয়ে আছেন আরিজোনা, ফ্লোরিডা, মিশিগান, মিনেসোটা, নেভাদা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আইওয়া, পেনসিলভানিয়া, ভার্জিনিয়া এবং উইসকনসিনে। জো বাইডেনের জন্য ভালো খবর হচ্ছে এসব রাজ্যে তিনি বড় রকমের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালের নির্বাচনে এসব রাজ্যের অধিকাংশেই ব্যাপক ভোটে জয়ী হয়েছিলেন ট্রাম্প।
এনবিসি নিউজ ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের নতুন জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ বলেছেন, ২৯ সেপ্টেম্বরের বিতর্কে তুলনামূলক ভালো করেছেন। অন্যদিকে ২৪ শতাংশ বলেছেন, বাইডেন নন ট্রাম্পই ভালো করেছেন। আর ১৭ শতাংশ বলেছেন, দুই প্রার্থীর কেউই কারও চেয়ে ভালো করেননি। অবশ্য সার্বিকভাবে ৭৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, ওই বিতর্কে দুই প্রার্থী যেমনই করুক না কেন, তা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।
এদিকে এ বছরের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম দখল করে আছে করোনাভাইরাস। মহামারীর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তার পক্ষে বিপক্ষে কথা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব ব্যবস্থা নিয়েছেন তার পক্ষে সমর্থন তুঙ্গে ওঠে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে। তখন তিনি সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন এবং ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে রাজ্যগুলোর জন্য ঘোষণা করেছিলেন ৫ হাজার কোটি ডলার। এনবিসি নিউজ ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের হিসাব অনুসারে এখন ৩৫ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের গৃহীত পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। আর তার দলের মধ্য থেকে সমর্থন দিয়েছেন ৭৫ শতাংশ মানুষ।
সর্বশেষ এই জরিপে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দায়িত্ব পালনের ওপরে ভোটারদের আস্থা-অনাস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে। ৪৩ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছেন। এর আগের এনবিসি নিউজ/ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের জরিপের চেয়ে এটা ২ পয়েন্ট কম। ৫৫ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে বাইডেনের প্রতি আস্থা ও অনাস্থা যথাক্রমে ৪৩ ও ৪১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে অ্যামি কোনি বারেটকে সম্প্রতি মনোনীত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওই ঘটনার পর এনবিসি নিউজ ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এটাই প্রথম জরিপ। উত্তরদাতাদের ৩৫ শতাংশ বারেটের মনোনয়নকে সমর্থন করেছেন। বিরোধিতা করেছেন ৩৩ শতাংশ। ৩০ শতাংশ বলেছেন, এ বিষয়ে মত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। এ ছাড়া ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা সুপ্রিম কোটের এই আসন পূরণের জন্য নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পক্ষে। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ বলেছেন, অপেক্ষা না করে এখনই বিষয়টা চূড়ান্ত করা দরকার।
তবে জয়-পরাজয়ে এইসব জরিপের ফলাফলের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোন রাজ্যের কত ভোট সেটা নির্ভর করে ওই রাজ্যের জনসংখ্যার ওপর। ২০২০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে রাজ্যগুলোকে ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট রয়েছে টেক্সাস রাজ্যের ৩৮। আর সেখানে এখনো এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। অবশ্য ইলেকটোরাল কলেজের মোট ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী হতে হলে তাকে ২৭০টি ভোট পেতে হবে।