ভূমিসংক্রান্ত মামলার রায়, আদেশ ও ডিক্রি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে ভূমি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে আদেশ বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এ বিষয়ে হলফনামা দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে গত বছরের ২৫ জুলাই রায় ঘোষণা করেছিল বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ। সম্প্রতি ১১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৫ বছর ধরে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে না পারায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরতদের প্রতি উষ্মা প্রকাশ ও কঠোর সমালোচনা করে মন্ত্রী-সচিবদের কৈফিয়ত চাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সংশোধিত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল এবং ল্যান্ড সার্ভে আপিলের ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা আছে। আইন অনুযায়ী দেশে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়নি। ফলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের রায়, ডিক্রি এবং আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ বা বিচারপ্রার্থীকে প্রতিকারের জন্য আসতে হচ্ছে হাইকোর্টে। ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানির সময় হাইকোর্টের নজরে আসে যে, দেশে কোনো ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল নেই। এরপর একই বছরের ৩ মার্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল নিয়ে রুল জারি করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ। শুনানি নিয়ে গত বছরের ২৫ জুলাই এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত রায় দেয় হাইকোর্ট।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ‘২০০৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছরে ভূমি মন্ত্রণালয় আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় লাখ লাখ মানুষ চরম ও সীমাহীন দুর্ভোগে নিমজ্জিত হয়েছে। যেখানে জাতির পিতা সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন সাধারণ জনগণকে হয়রানিমুক্ত বিচার প্রদানের জন্য। যেখানে জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে জাতীয় সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শাসনতন্ত্র তথা সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন ৯ মাস সময়ের মধ্যে প্রণয়ন করেছেন, সেখানে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে “এক পাতার” একটি প্রজ্ঞাপন করতে না পারা ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং সচিবের চরম ব্যর্থতা। সরকার আইন যথাযথ এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে, এটাই সকলের কাম্য।’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কঠোর সমালোচনা করে রায়ে বলা হয়, ‘সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দেশের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সেই জনগণকে ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর যাবৎ হয়রানি করে চলেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এই সময় ধরে ভূমি মন্ত্রণালয় এ দেশের মালিক জনগণকে তার আইনসম্মত প্রাপ্য অধিকার থেকে, তথা আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল মামলা দায়েরের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার যেমন লঙ্ঘিত হচ্ছে, তেমনি জনগণ সুবিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরা আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগ না করে জনগণের সঙ্গে অমানবিক, নিষ্ঠুর এবং ক্ষমার অযোগ্য আচরণ করেছেন।’
রায়ে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে।’ আদালত বলে, ‘অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও সচিবের কাছ থেকে লিখিত আকারে এ বিষয়ে কৈফিয়ত নিয়ে বর্তমান মন্ত্রী ও সচিব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জনগণের পক্ষে গ্রহণ করবেন।’