মৃতুদন্ডের আইন ও ধর্ষণের মিথ্যা মামলা

দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃতুদন্ডেরবিধান সমাজে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতুদন্ডেরবিধান সংক্রান্ত অধ্যাদেশে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার থেকে আইনটি কার্যকর হলো। আইন বিশেষজ্ঞ এবং নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনের নেতারা আইনের এই সংশোধনীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অবশ্য একইসঙ্গে তারা বলেছেন, শুধু আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতুদন্ড যুক্ত করেই ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না। এজন্য আইনটির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। লক্ষ করা দরকার, এই আইনে আগে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডেরযে বিধান ছিল তারও যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাক্ষী সুরক্ষা এবং নির্যাতনের শিকার নারী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে এবং এমন অপরাধে কঠিন শাস্তির ভীতি সমাজে ছড়িয়ে দিতে হলে রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে যারা ধর্ষককে রক্ষা করতে চান তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি। এদিকে মৃতুদন্ডেরবিধান যুক্ত হলেও ধর্ষণের মিথ্যা মামলার সাজা অপর্যাপ্ত থাকায় মিথ্যা মামলা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।

আইন ও বিচারবিভাগ সংশ্লিষ্ট বলছেন, আমাদের দেশে মিথ্যা মামলা একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে এ নিয়ে ফৌজদারি আইনে যেমন সাজার বিধান রয়েছে, তেমনি দেওয়ানি আইনেও ক্ষতিপূরণের প্রতিকার রয়েছে। ধর্ষণের মামলায় যেহেতু এখন মৃতুদন্ডেরশাস্তি যুক্ত হয়েছে তাই শত্রুতাবশত মিথ্যা মামলা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অমলূক নয়। এটা ঠেকাতে হলে মিথ্যা মামলার শাস্তিও বাড়াতে হবে। কেননা মিথ্যা মামলায় মানুষ সামাজিক, পারিবারিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। শাস্তি বাড়ালে মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন স্থান কিছু অসাধু চক্র সম্পত্তির বিরোধ, পারিবারিক বিরোধ বা প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মিথ্যা মামলা ঠুকে দেয়। পুলিশের তদন্তেও নারী নির্যাতন মামলার মধ্যে কিছু কিছু মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ ধরনের অপরাধ ঠেকানোর জন্য নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মিথ্যা মামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর সাজার বিধান করা উচিত।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি ধারায় ধর্ষণজনিত কারণে কারো মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রসঙ্গে বলা ছিল, দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড। নতুন অধ্যাদেশে ধারাটি সংশোধন করে ‘যাবজ্জীবন অথবা মৃতুদন্ডের’ বিধান আনা হয়েছে। তবে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা আহত হলে, সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃতুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড। সেই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রেই ন্যূনতম ১ লাখ টাকা করে অর্থদন্ডের বিধানও রয়েছে। এখন আইনটির সংশোধন করে ধর্ষণ প্রমাণিত হলেই মৃতুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডেরশাস্তির বিধান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে অর্থদন্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলায় শাস্তির বিধান রয়েছে। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তি এবং যিনি অভিযোগ দায়ের করিয়েছেন সেই ব্যক্তির অনধিক ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ড এবং অর্থদন্ড হতে পারে। এমন মিথ্যা অভিযোগের বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন হবে।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃতুদন্ড হওয়ায় মিথ্যা মামলার প্রবণতা যাতে না বাড়ে সেজন্য মিথ্যা মামলার সাজা বর্তমান ৭ বছরের কারাদন্ড থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১০ বছর করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন একজন প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী। অবশ্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কেউ কেউ এমন  প্রবণতা কমিয়ে আনতে ধর্ষণের মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডেরবিধান যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে, মৃতুদন্ডেরআইন করলেই যেমন ধর্ষণ রোধ করা যাবে না, তেমনি কঠোর দন্ড থাকলেই মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা নিবৃত্ত করা যাবে না। এজন্য সবার আগে আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা জাগাতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে।