পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবীমা

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে কয়টি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প অন্যতম। দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ জোগান দেয় এই খাত। করোনা মহামারীর আগ পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হতো। দেশের প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমশক্তি এ খাতে নিয়োজিত, যার বেশিরভাগই নারী। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতা অব্যাহত রাখার জন্য স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে। এখন এ খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর যে পদক্ষেপ সরকার নিতে চাইছে নিঃসন্দেহে তা খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ।

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘সরকারের প্রস্তাবে রাজি মালিকরা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডস সরকারের এসএনভির কারিগরি সহায়তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের তত্ত্বাবধানে সরকার তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে চাইছে। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরাও সম্মত হয়েছেন। এই বীমার মাধ্যমে শ্রমিক-মালিক-দাতাদের বার্ষিক ৫৭৫ টাকা জমার বিনিময়ে একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকার স্বাস্থ্যসেবা ভোগ করতে পারবেন। বীমা প্রকল্প চালু হলে শ্রমিক, মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষ সবাই লাভবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মালিকরা দাবি করেছেন যে, বীমার প্রিমিয়ামের টাকা ব্যবহৃত না হলে সুদসহ ফেরত দেওয়ার বিধান থাকতে হবে। 

এখনো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের সিংহভাগ ব্যক্তির ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৩ শতাংশ ব্যক্তি নিজে বহন করে। আর বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়ের কবলে পড়ে প্রতিবছর ৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হয়। বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় একটি পরিবারের শুধু ব্যয়ই বাড়ায় না, উৎপাদনশীলতাও কমায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ১ শতাংশেরও কম মানুষ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় এসেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সরকারি এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বৃহৎ অংশই স্বাস্থ্যবীমার ওপর নির্ভরশীল। এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও ‘যোজনা’ নামক রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবীমা ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নেপালেও ‘সার্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প’ চালু করা হয়েছে। করোনা মহামারীর মতো মহাদুর্যোগে জার্মানিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ স্বাস্থ্যবীমার উপযোগিতাকে যেভাবে প্রমাণ করেছে, তা শিক্ষণীয়।  বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যবীমার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হওয়ার প্রেক্ষিতে অল্প কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের বীমা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  এক্ষেত্রে তৈরি পোশাকশিল্পের মতো সবচেয়ে বড় রপ্তানি আয়ের খাতটিতে শ্রমিক সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবীমা খুবই জরুরি বিষয়।

একসময় অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা কর্মরত থাকতেন, তা থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণের সম্ভাবনা এখন তৈরি হচ্ছে। রানা প্লাজা কিংবা তাজরীন ফ্যাশনস ট্র্যাজেডি পেরিয়ে দেশের সাতটি কারখানা এখন বিশ্বের সেরা দশ পরিবেশবান্ধব কারখানার তালিকায় অবস্থান করে নিয়েছে।  তারপরও এ খাতের শ্রমিকদের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে, করোনা মহামারীতে এ খাতে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও মাইক্রো ফাইন্যান্স অপরচুনিটিজের (এমএফও) তথ্যানুযায়ী, এ সংকট দেশের কমপক্ষে ৮২ শতাংশ পোশাকশ্রমিকের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলেছে।  তারপরও এ খাতের শ্রমিকদের প্রচেষ্টায় দেশের রপ্তানি আয়ের চাকা সচল থাকছে। জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৫৭০ কোটি ডলারের। তাই তৈরি পোশাকশিল্পের সম্ভাবনাকে অব্যাহত রাখতে শ্রমিকদের যেমন কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি তাদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তবে মালিকরা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবীমা চালুর ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম বিষয়ে যেসব শর্ত আরোপ করতে চাইছেন, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তারা প্রিমিয়ামের অব্যবহৃত অর্থ সুদসহ ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু যদি প্রিমিয়ামের অর্থ সুদসমেত ফেরত দিতে হয়, তাহলে অনেক কোম্পানিই স্বাস্থ্যবীমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। শ্রমিকদের জন্য কারখানার কার্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থের দশমিক ০৩ শতাংশ নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় তহবিল রয়েছে। যার পরিমাণ বছরে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা। দেশের শ্রম আইনে কারখানা চালিয়ে প্রাপ্ত মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা থেকে তৈরি পোশাক শিল্পকে অব্যাহতি দিয়ে এ কেন্দ্রীয় তহবিল গঠনের নিয়ম চালু করা হয়েছিল। এখন কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের আয়ের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে প্রিমিয়ামের অর্থ প্রদান করলে স্বাস্থ্যবীমা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন হতে পারে। সর্বোপরি, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করার বিকল্প নেই।