মাদ্রাসাছাত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণ

টাঙ্গাইলে ৫ আসামির ফাঁসির রায়

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে অপহরণের পর দল বেঁধে ধর্ষণের দায়ে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক খালেদা ইয়াসমীন এ রায় ঘোষণা করেন।

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এ অধ্যাদেশ জারির পর ধর্ষণের মামলায় এটিই প্রথম ফাঁসির রায়। তবে সংশোধিত আইনে নয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০-এর আলোকেই গতকালের এ রায় ঘোষণা করেছেন বিচারক।

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তরা হলো টাঙ্গাইলের মধুপুরের গোলাবাড়ী গ্রামের সাগর চন্দ্র শীল ও গোপী চন্দ্র শীল এবং চারাল জানী গ্রামের সুজন মনি ঋষি, রাজন মনি ঋষি ও সত্যজিৎ মনি ঋষি। এদের মধ্যে সাগর, সুজন ও রাজন জামিন নিয়ে পলাতক।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সালের জানুযারি মাসে ভূঞাপুর উপজেলার ছাব্বিশা গ্রামের এক মাদ্রাসাছাত্রীর সঙ্গে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া সাগর চন্দ্র শীলের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় হয়। ১৫ জানুয়ারি সকালে ওই ছাত্রী বাড়ি থেকে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে শালদাইর ব্রিজের কাছে পৌঁছলে সাগর কৌশলে একটি সিএনজিতে তুলে তাকে এলেঙ্গা নিয়ে যায়। সেখান থেকে মধুপুরে চারাল জানী গ্রামে তার বন্ধু রাজনের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে তার চার বন্ধু ওই ছাত্রীকে সাগরের সঙ্গে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। কিন্তু সাগর হিন্দু বলে ছাত্রী বিয়েতে রাজি হয়নি। এ কারণে সাগর ক্ষুব্ধ হয়ে ওই রাতে রাজনের বাড়িতে আটকে রেখে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। পরে ১৭ জানুয়ারি রাতে ওই ছাত্রীকে বংশাই নদীর তীরে নিয়ে সেখানে তারা পাঁচজন মিলে ধর্ষণ করে এবং মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন অংশ কামড়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। একপর্যায়ে মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় সাগর ও তার সঙ্গীরা। পরদিন সকালে জ্ঞান ফিরলে স্থানীয় এক মুয়াজ্জিনের সহায়তায় উদ্ধার পায় মেয়েটি। এ ঘটনায় ওই ছাত্রী বাদী হয়ে তিন দিন পর ১৮ জানুয়ারি দণ্ডিত পাঁচজনকে আসামি করে ভূঞাপুর থানায় মামলা করে। পরে পুলিশ সুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। ১৯ জানুয়ারি আসামি সুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে অন্য আসামিরাও গ্রেপ্তার হয়। এরপর পুলিশ তদন্ত শেষে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর পাঁচ বছর শুনানি শেষে আদালত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিল।

মামলার বাদীকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার পক্ষ থেকে আইনগত সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান সংস্থাটির টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আতাউর রহমান আজাদ। তিনি বলেন, রায়ে তারা সন্তুষ্ট। ন্যায্য বিচার তারা পেয়েছেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা মিয়া বলেছেন, রায়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এ রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি একেএম নাছিমুল আক্তার নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০-এর আলোকেই আজকের (গতকাল) এ রায় ঘোষণা করেছেন বিচারক। সংশোধিত আইনে নয়। এ আইন বলেই টাঙ্গাইলের আদালতে এর আগেও ধর্ষণের একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলায় ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।’

গত ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০’ সংশোধন করে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর সংশোধনী ২০২০ এর ৯ এর (১)/৩৪ ধারা) অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর পরদিন ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

গত ৪ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশজুড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেও প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্ষণের ঘটনার খবর মিলছে।