স্থবির পদোন্নতি সচলের পরিকল্পনা পুলিশে

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫২ এএম

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও পুলিশে অস্থিরতা কাটছে না। এটা দূর করতে স্থবির হওয়া পদোন্নতি সচলের জন্য বিশদ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের হাইকমান্ড নির্দেশনা দিয়ে বলেছে যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদন্নোতি পাচ্ছে না, এটা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। পাশাপাশি যেসব পদে শূন্য আছে, তা পূরণ করতে বিশেষ বৈঠক হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পশাপাশি ফিটলিস্টের মাধ্যমেও পদায়ন করা যায় কিনা খতিয়ে দেখছেন পুলিশের নীতিনির্ধারকরা।

সরকারের বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি হলেও পুলিশের উচ্চপদে পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও উপমহাপরিদর্শক পর্যায়ে একাধিক শূন্যপদ থাকার পরও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভাবে পদোন্নতি হচ্ছে না। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সভা আহ্বান না করায় পুরো প্রক্রিয়াই আছে আটকে। এতে শুধু উচ্চ পর্যায়ের পদোন্নতিই নয়, নিচের ধাপের পদোন্নতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা দূর করতে চলতি মাস বা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে এসএসবিসহ অন্যান্য বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েই পুলিশে ব্যাপক রদবদল করে। তৎকালীন পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ পুলিশের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমনপীড়ন চালানো নিয়ে সমালোচনা হয়। সাবেক আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যের বিরুদ্ধে থানা ও আদালতে মামলা হয়েছে। আবার পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও চলে গেছেন ‘আত্মগোপনে’। পরে আইজিপিসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও কয়েক মাস পর আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের নিয়োগ বাতিল করে বাহারুল আলমকে আইজিপি ও শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়। দুইজনই একটি বিশেষ মহলের তদবিরে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ উঠে। বিএনপি সরকারের অনুকম্পা পেতে পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তা দলটির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফায়দা নিয়েছে এবং এখনো নিচ্ছে।

রাজনৈতিক তদবির : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বড় বড় পদ পেতে পুলিশ কর্মকর্তারা বিএনপি নেতাদের কাছে তদবির করছেন। একেকজন একেক বলয়ের দোহাই দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পুলিশ কখনো রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে বের হতে পারবে না। পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তারা আগের মতোই অবহেলিত। কারও কাছে তারা ‘তদবিরও’ করতে পারেন না। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কিছু কর্মকর্তা ভালো স্থানে থেকেও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন। কেউ কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের মতো কা-জ্ঞানহীন তোষামোদি করেন। এসব থেকে পুলিশকে বের হওয়া দরকার। তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করছে। যারা যোগ্য সেখানেই তাদের পদায়ন করা হচ্ছে। কোনো তদবিরে কাজ হচ্ছে না।   

দীর্ঘদিন বন্ধ এসএসবিসহ পদোন্নতির বৈঠক : পুলিশ সূত্র জানায়, পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের বিবরণ, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন, গোয়েন্দা সংস্থার ভেটিং রিপোর্টসহ সব ধরনের নথি এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সভা আহ্বানের উদ্যোগ না নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া আটকে আছে। পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তাই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ১৪৩ জন অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি এবং একাধিক পুলিশ সুপারকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সংখ্যক পদ শূন্য হয়নি। কারণ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নিয়মিত পদের বিপরীতে বেশিসংখ্যক সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।

পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে জরুরি বৈঠক : গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠক হয়েছে। সেখানে পুলিশের কনস্টেবল থেকে ডিআইজি পদমর্যাদা পর্যন্ত সব পর্যায়ের সদস্যদের পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেনসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রকাশ্য আসছে অস্থিরতা : পুলিশের ভেতরে নীরব অস্থিরতা ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ, অন্যদিকে পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে তীব্র গ্রুপিংও হচ্ছে। একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছড়ানোর প্রবণতা বেশি হওয়ায় প্রভাব পড়ছে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বাহিনীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডেও। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোশিয়েশন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

পুলিশের দলবাজি এক দিনে গড়ে উঠেনি : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের ভেতর দলবাজির বিষয়টি এক দিনে গড়ে উঠেনি। এটি সব সরকারের আমলেই ছিল। আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের ভেতরই একাধিক গ্রুপ ছিল। ওই সব গ্রুপের নেতারা কারও নির্দেশই মানতেন না। বর্তমানে যারা দলবাজি করছেন, তারাও একসময় চরম অবহেলিত ছিলেন। সরকার পুলিশকে জনগণের আস্থার জায়গায় নিতে চাইলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করতে হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে এবং প্রকৃত পুলিশিং ফিরে আসবে।

পদোন্নতি হলেই খুলবে জট : ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের আগেই সামাজিক মাধ্যমে কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়ে যাচ্ছে। এমনকি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, তারাও নানা অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন। বাহিনীর ভেতরের বিভক্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, একজন কর্মকর্তা অন্যজনকে দুর্বল করতে বিভিন্ন উপায়ে তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদোন্নতির জন্য ১৪ কর্মকর্তার একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কিছুদিন আগে পাঠানো  হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি পদে পাঁচজনকে পদোন্নতি দেওয়া হলে অন্তত পাঁচটি ডিআইজি পদ শূন্য হবে। পরবর্তী ধাপে ডিআইজি পদেও পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে একটি সিদ্ধান্ত পুরো পদোন্নতি শৃঙ্খলকে সচল করতে পারে।

ফিটলিস্ট করে আমলে নেওয়ার পরিকল্পনা : পুলিশের কিছু সদস্যের বদলি ও পদায়ন নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। ফিটলিস্ট না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের বাছাই করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ও নির্দিষ্ট এলাকার লোকজন পদায়নের জন্য প্রাধান্য পাওয়ার নজিরও আছে। পুলিশের ভেতরে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষে যোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকা থাকলে পদায়নের মানদণ্ড হিসেবে তা বিবেচিত হবে। আবার সদস্যদের মধ্যেও একটি বার্তা যাবে ফিটলিস্টে থাকতে চাইলে তাকে কিছু নিয়মনীতির মধ্যে চলতেই হবে।

সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি : পুলিশ কর্মকর্তারাও চাচ্ছেন পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি কমিশনের অধীনেই হোক। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় এক শ্রেণির দলবাজ, লাইনবাজ, ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আর ব্যবহার হতে চাচ্ছেন না তারা। বদলি ও পদোন্নতি সমানভাবে করতে হবে। রাজনৈতিক নেতা ও দল পুলিশকে ব্যবহার করতে পারবে না। ১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইনে পুলিশ পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮ সালের ৫ নম্বর আইন), সাক্ষ্য আইন (১৮৭২ সালের ১ নম্বর আইন), পুলিশ প্রবিধানমালা বেঙ্গলসহ (১৯৪৩) অন্যান্য আইনে কার্য সম্পাদন করে থাকে পুলিশ। ব্রিটিশ আমলের এসব আইন পরিবর্তন করা জরুরি হলেও করা হচ্ছে না। সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে জুনিয়ররাও এখন পদোন্নতি পেয়ে যাচ্ছেন।

পুলিশে একাধিক পদ হচ্ছে না পূরণ : বর্তমান সরকার সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি না দিয়ে নতুন পদ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর করা হয়নি। পুলিশের নিয়মিত ডিআইজি পদের সংখ্যা ৮৭। বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮২ জন। পাঁচটি পদ এখনো শূন্য আছে। পুলিশের বিসিএস ২০ ব্যাচের বেশ কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে গ্রেড-২ এর ২০টি এবং গ্রেড-১ এর দুটি পদসহ মোট ২২টি পদ রয়েছে। এখানেও পাঁচটি পদ খালি রয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে পাঁচটি সুপারনিউমারারি পদ রয়েছে। বিসিএস ১৭, ১৮ ও ২০ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত