বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বিভিন্ন ধরনের ৬৪টি আইন ও বিধির নিষ্পত্তি করতে পারছে না ২২ মন্ত্রণালয়ের ২৭টি বিভাগ। উচ্চ আদালত সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষণা করার পরও কার্যকারিতা থাকায় কিছু আইন ও বিধান বহাল রাখা হয়েছে। এসব আইন ও বিধি সংশোধন করে সময়োপযোগী করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও মন্ত্রণালয়গুলো এর নিষ্পত্তি করতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনিষ্পত্তিকৃত এসব অর্ডিন্যান্স নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে ২২ মন্ত্রণালয়ের একজন করে যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। সামরিক শাসনামলের অধ্যাদেশগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনসহ শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে তাদের বৈঠকে অংশ নিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ২৭ জুলাই সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো আইনে পরিণত হয়নি, সেগুলোকে আইনে রূপান্তরে তিন মাস সময় বেঁধে দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। নিষ্পত্তির এই ডেটলাইনও চলতি মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যেসব মন্ত্রণালয় এখনো সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে পারেনি তাদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছে। জানা গেছে, সকাল ১০টায় শুরু হয়ে এ বৈঠক চলবে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। সেখানে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১০ মিনিট করে তাদের অবস্থান তুলে ধরবে। অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ মিনিট করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের সময়াবদ্ধ বৈঠক সাধারণত অনুষ্ঠিত হয় না। কিন্তু সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওপর সমান ফোকাস করার জন্য সময়াবদ্ধ শিডিউল করা হয়েছে।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় অনুযায়ী দুটি সামরিক সরকারের শাসনামল অবৈধ হয়ে যায়। তাই ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সময়ের মধ্যে জারি করা সব অধ্যাদেশও অবৈধ। ওই দুই সামরিক শাসনামলে ১৭২টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশগুলোকে আইনি ভিত্তি দিতে ২০১৩ সালে ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জারিকৃত অধ্যাদেশ ‘কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১৩’ এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সময়ের মধ্যে জারিকৃত কতিপয় অধ্যাদেশ ‘কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) আইন-২০১৩’-এর খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সেই অনুযায়ী যেসব অধ্যাদেশের প্রয়োজন রয়েছে সেগুলো যুগোপযোগী করে বাংলায় অনুবাদসহ আইনের খসড়া হিসেবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে বিল আকারে পাস করে আইনে পরিণত করা হচ্ছে।
২৭ জুলাইয়ের ভার্চুয়াল মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘যতগুলো অধ্যাদেশ আছে সেগুলোকে আইনে পরিণত করতে হবে বলে আগেই সিদ্ধান্ত ছিল। আগামী তিন মাস আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে এটি ফাইনাল করে ফেলতে হবে।’
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব অর্ডিন্যান্সকে আইনে পরিণত করার কাজ আটকে আছে সেগুলোর মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্সও রয়েছে। অনেক অর্ডিন্যান্স সংশোধন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। অনেক দিনের পুরনো এসব অর্ডিন্যান্স সময়োপযোগী করতে গিয়ে আমূল বদলে ফেলতে হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে কি না তাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে মন্ত্রণালয়গুলোকে। অনেক অর্ডিন্যান্স বদলাতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিন্তাভাবনা করে এগোতে হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্ডিন্যান্স, মেট্রোপলিটন পুলিশ, আইন-আদালত সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্সও রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়ের অর্ডিন্যান্সই রয়েছে ঝুলে থাকার তালিকায়। খোদ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তিনটি অর্ডিন্যান্স এখনো সময়োপযোগী করা হয়নি। ১১টি করে অর্ডিন্যান্স ঝুলছে অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছয়টি এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি অর্ডিন্যান্স রয়েছে। দুটি করে অর্ডিন্যান্স রয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। সব মিলিয়ে ঝুলে থাকা অর্ডিন্যান্স ৬৪টি।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আটকে থাকা দুটি অর্ডিন্যান্সের একটি চট্টগ্রামের শাহী মসজিদ এবং অন্যটি জাকাত বোর্ড নিয়ে। আমরা দুটো অর্ডিন্যান্সেরই খসড়া আইন তৈরি করেছি। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এসব খসড়া আরও আধুনিক এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে আরও সময়োপযোগী করার নির্দেশনা দিয়েছে।’
সবচেয়ে বেশি অধ্যাদেশ আটকে আছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এ বিভাগের বাস্তবায়নাধীন অর্ডিন্যান্স ৯টি। এসব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার কাজের অগ্রগতি জানানোর জন্য আগামীকালের বৈঠকে ১০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের দ্য রেগুলেশন অব সেলারি অব এমপ্লয়িজ ল’জ (রিপিল) অর্ডিন্যান্স ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দ্য ফিনানশিয়াল ইনস্টিটিউশনস ল’জ অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স ঝুলে আছে। সব মিলিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্ডিন্যান্স ১১টি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যেসব অর্ডিন্যান্স এখনো সময়োপযোগী করা হয়নি সেগুলো হচ্ছে ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬ সালের ‘দ্য ফিনান্স অর্ডিন্যান্স’ এবং ১৯৮৪ সালের ‘দ্য ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স’।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সাতটি অর্ডিন্যান্স এখনো আইনে পরিণত করা হয়নি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গান্ধী আশ্রম অর্ডিন্যান্স; সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ভ্রমণভাতা অর্ডিন্যান্স; সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্মানী ও সুবিধাদি অর্ডিন্যান্স; দ্য ল রিফর্মস অর্ডিন্যান্স; সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ছুটি, পেনশন এবং সুবিধাদি অর্ডিন্যান্স; দ্য ফ্যামিলি কোর্টস অর্ডিন্যান্স এবং দ্য ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ল’জ অর্ডিন্যান্স। জননিরাপত্তা বিভাগের যেসব অর্ডিন্যান্স এখনো সময়োপযোগী করা যায়নি সেগুলো হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স; পুলিশ অফিসার্স স্পেশাল পেনশন অর্ডিন্যান্স; আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স এবং পুলিশ ননগেজেটেড এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার ফান্ড অর্ডিন্যান্স। ভূমি মন্ত্রণালয়ের যেসব অর্ডিন্যান্স এখনো ঝুলে আছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটবাজার ব্যবস্থাপনা অর্ডিন্যান্স, ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ফরেন ভলানটারি অরগানাইজেশনস প্রপারটি রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স, ল্যান্ড রিফার্ম অর্ডিন্যান্স এবং ভূমি খতিয়ান অধ্যাদেশ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চট্টগ্রাম ডিভিশন ডেভেলপমেন্ট বোর্ড অর্ডিন্যান্স ও অফশোর ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ডিশোলুশন অর্ডিন্যান্স, দ্য ডিস্ট্রিক্ট (এক্সটেনশন টু দ্য চিটাগাং হিলট্রেক্টস) অর্ডিন্যান্স।
লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের অর্ডিন্যান্সগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সি অর্ডিন্যান্স; পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স; দ্য লিডার, ডেপুটি লিডার অব দ্য অপজিশন (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অর্ডিন্যান্স; দ্য চিফ ইলেকশন কমিশনার এবং কমিশনারস রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস অর্ডিন্যান্স। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনিষ্পন্ন অর্ডিন্যান্সের মধ্যে রয়েছে আইসিডিডিআর,বি অর্ডিন্যান্স; দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্স; দ্য ড্রাগ কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স এবং দ্য ড্রাগ সাপ্লিমেন্টারি প্রভিশনস অর্ডিন্যান্স। এ ছাড়া স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের দ্য ফার্মেসি অর্ডিন্যান্স, হোমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স রয়েছে ঝুলে থাকা অর্ডিন্যান্সের তালিকায়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঝুলে থাকা অর্ডিন্যান্সগুলো হচ্ছে ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স ও মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অনিষ্পন্ন অর্ডিন্যান্সগুলো হচ্ছে ইউনিভার্সিটিজ ল’জ অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স ও সন্তোষ ইসলামী ইউনিভার্সিটিজ অর্ডিন্যান্স। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঝুলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্সটি হচ্ছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন অর্ডিন্যান্স। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড অর্ডিন্যান্স, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এবানডেন্ড চিলড্রেন অর্ডিন্যান্স এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফরেস্ট প্রটেকশন অর্ডিন্যান্স এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কৃষিশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিবিষয়ক অডিন্যান্স; জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড মিনারেল করপোরেশন অর্ডিন্যান্স; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অর্ডিন্যান্স; গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স; প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স অর্ডিন্যান্স; শিল্প মন্ত্রণালয়ের পাবলিক করপোরেশন অর্ডিন্যান্স এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ইরিগেশন রেট অর্ডিন্যান্স ও বিধি ম্যানুফ্যাকচার (প্রোহিবিশন) অর্ডিন্যান্স এখনো ঝুলে আছে।