বদলির নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি খুলনার সিভিল সার্জনের!

খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদসহ দেশের ৮ জেলার সিভিল সার্জনকে গত ২৪ আগস্ট একযোগে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থল গোপালগঞ্জে যোগ দেওয়ার কথা সুজাত আহমেদের। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনো আগের কর্মস্থলেই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বদলির প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ৭ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে ৮ম কর্মদিবস থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবে। কিন্তু প্রায় দুই মাস পার হতে চললেও একদিকে যেমন সুজাত আহমেদ কর্মস্থল ত্যাগ করেননি, তেমনি তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি মন্ত্রণালয়ও। তবে সুজাত আহমেদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের সচিবের মৌখিক নির্দেশে তিনি খুলনায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

খুলনার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো জেলার স্থায়ী বাসিন্দার সেই জেলাতে কর্মরত থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু খুলনার পাইকগাছা উপজেলার বাসিন্দা হয়েও ডা. সুজাত আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে খুলনায় কর্মরত রয়েছেন। আর এই সময়কালে তার বিরুদ্ধে দরপত্রে অনিয়মসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ কারণে তাকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না মেনে তিনি খুলনায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে তাকে বদলি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিলের জন্য চেষ্টা করছেন।

খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি (সুজাত) মন্ত্রণালয়ের ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কোনো নিয়ম মানছেন না। গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন এখানে বদলি হয়েছিলেন। কিন্তু সুজাত মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে এখানে কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। সব জেনেও মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না।’

খুলনার সিভিল সার্জনের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে চলতি বছরের ২ জুলাই ‘সরকারি সুবিধা নিয়ে সিভিল সার্জনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুজাত আহমেদ খুলনার সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদান করেন গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর। এর আগে তিনি কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা (ইউএইচঅ্যান্ডএফপিও) কর্মকর্তা ছিলেন। আগের সিভিল সার্জন ডা. এ এম এম আবদুর রাজ্জাক অবসরকালীন ছুটিতে গেলে ডা. সুজাত আহমেদকে খুলনার সিভিল সার্জনের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সিভিল সার্জনের দায়িত্ব নেওয়ার পরই স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগে ২১৭ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে দরপত্রে নতুন শর্ত যুক্ত করায় তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এর বাইরেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। দেশে করোনারভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ কর্মস্থল ছেড়ে সপ্তাহের তিন দিন ব্যস্ত থাকেন ১০০ কিলোমিটার দূরবর্তী কয়রা উপজেলায় নিজের ব্যক্তিগত চেম্বারে। শুধু তাই নয়, সেখানকার সরকারি কোয়ার্টারের একটি কক্ষে গড়ে তোলা নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখার পাশাপাশি করছেন অস্ত্রোপচার। যদিও সরকারি চিকিৎসকরা নিজ কর্মস্থলের বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না বলে গত বছরই নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখানেই শেষ নয়, সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ অবচেতনবিদ ছাড়াই নিজ চেম্বারে অস্ত্রোপচারের পর সেই রোগীদের থাকতে দেন কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যায়। অনেক সময় আবার নিজের ব্যক্তিগত রোগীদের জন্য ব্যবহার করেন হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ। ওই রোগীদের ওষুধও দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। তবে এজন্য কোনো টাকা জমা হয় না হাসপাতালের তহবিলে। আয়ের পুরো অংশই যায় তার পকেটে। গত এক মাসে তার কাছে অস্ত্রোপচারের পর ২ রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া করোনা সচেতনতামূলক একটি ভিডিও ক্লিপ তৈরির পর তা ফেইসবুকসহ স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রচার করেন সুজাত আহমেদ, যেখানে জাতীয় সংগীতকে অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একমাসে ২ রোগীর মৃত্যু : কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচারের পর রক্তক্ষরণে নাসিমা খাতুন (৪০) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার মসজিদকুড় গ্রামের আবুল হোসেন মিস্ত্রীর স্ত্রী। ওই প্রসূতির প্রসব বেদনা উঠলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। গত ১৫ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে সুজাত আহমেদ তার অস্ত্রোপচার করেন। এ সময় ওই প্রসূতির একটি ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। পরদিন ১৬ অক্টোবর সকাল ১০টায় তিনি মারা যান।

মৃত্যু হওয়া প্রসূতির ভাই গ্রাম পুলিশ কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর সুজাত আহমেদ তার বোনের সিজার করবেন বলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্স চায়নার মাধ্যমে ৮ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় সেখানে কোনো অবচেতনবিদ উপস্থিত ছিলেন না। তাছাড়া জরুরি প্রয়োজনের জন্য রক্তের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না সেখানে। সুজাত আহমেদ অস্ত্রোপচার করে টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর প্রসূতির রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ সময় হাসপাতালের কোনো চিকিৎসককে ডেকেও পাওয়া যায়নি। প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে গিয়ে রোগী দেখেন সুজাত আহমেদ। যে কারণে হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক তার দেখা কোনো রোগীর দায়িত্ব নিতে চান না।

এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর সুজাত আহমেদের ‘ভুলে’ পায়ে অস্ত্রোপচারের পর কয়রার আমাদী ইউনিয়নের নাকশা গ্রামের নাছির উদ্দিনের মেয়ে আমেনা (৯) মারা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মারা যাওয়া আমেনার মামা শরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার (আমেনা) পায়ে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। রিপোর্টও ভালো ছিল। কিন্তু অপারেশনের পর তার দেখাশুনার জন্য কোনো ডাক্তার ডেকেও পাওয়া যায়নি। পরে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার পথে সে মারা যায়।’

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত না থাকা সত্ত্বেও সেখানকার সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে সুজাত আহমেদের নিজের ব্যক্তিগত রোগী দেখার ব্যাপারে জানতে চাইলে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উনি (সিভিল সার্জন) আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমরা সরাসরি তার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি না। তবে তিনি প্রতি সপ্তাহে দুদিন এসে হাসপাতালে যেটা করেন তাতে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর আগেও তার অপারেশন করা এক রোগী মারা যাওয়ায় নানা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে আমাদের। টাকা নিয়ে তার রোগী অপারেশনের বিষয়ে উপজেলা সমন্বয় সভায়ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো কিছুই মানছেন না। এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

তার ‘ভুলে’ অস্ত্রোপচারের পর রোগী মৃত্যুর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সুজাত আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাসিমা আমার আত্মীয়। তিনি বেশ কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। আমি বৃহস্পতিবার গিয়ে তার সিজার করি। বয়স বেশি এবং একইসঙ্গে তার হার্টের সমস্যা ছিল। পরেরদিন অক্সিজেন ফেল করে মারা যায়। আর অপর রোগী আমেনার পায়ে একটি ফোঁড়া হয়েছিল। আমি শুধু পুঁজ বের করে দিয়েছিলাম। কিন্তু অনেক আগের ইনফেকশন রক্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার ওপর জ্বরও ছিল খুব। আমি তাকে খুলনায় পাঠিয়েছিলাম। অথচ দোষ হলো আমার। আমি কয়রায় টাকা নিয়ে রোগী দেখি না।’

বদলির নির্দেশ অমান্য করে খুলনায় অবস্থানের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি গোপালগঞ্জ রওনা করেছিলাম। কিন্তু সচিব স্যার আমাকে মৌখিকভাবে বলেন, গোপালগঞ্জে ল্যাব তৈরির কাজ শেষ হলে তবে আপনি সেখানে যাবেন। আপাতত আপনাকে যেতে হবে না।’

সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক রাশেদা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিভিল সার্জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিদর্শনে যেতে পারেন। তবে টাকার বিনিময়ে রোগী অপারেশন করতে পারেন না। তিনি যেটা করেছেন, খুব অন্যায় করেছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আর মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বদলির নির্দেশ অমান্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খুলনায় বদলি হয়ে যিনি আসবেন তিনি এখনো এসে পৌঁছাননি। তাই মৌখিকভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য সচিব তাকে (সুজাত আহমেদ) খুলনায় থাকতে বলেছেন।’