করোনাভাইরাসের প্রভাবে যে সংকট তৈরি হয়েছে তাতে বাংলাদেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) এক-তৃতীয়াংশ কর্মী কাজ হারিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যানাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আইএফসির এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বলছে, এক মাসের ব্যবধানে দেশের এমএসএমই খাতে বেকারত্ব বরণ করেছেন ৩৭ শতাংশ স্থায়ী বা অস্থায়ী কর্মী। এ সময় করোনার প্রাদুর্ভাবে এ খাতে বিক্রি কমেছে ৯৪ শতাংশ।
আইএফসি ও বিশ্বব্যাংক যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে ‘কভিড-১৯ বিজনেস পালস সার্ভে’ শীর্ষক সমীক্ষা পরিচালনা করে। এ সমীক্ষাটি চলতি বছরের জুন-আগস্ট সময়ে পরিচালনা করা হয়।
৫০০ এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, কর্মীদের ৭০ শতাংশ এখন অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে বন্ধ বা আংশিকভাবে চালু রয়েছে। জরিপ চলাকালীন দেখা গেছে, গড়ে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মাত্র ১০০ দিনের খরচ বহনের পুঁজি ছিল।
বাংলাদেশের ৯১ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বা তারল্য প্রবাহ সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় একই আকারের অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার ব্যবসায়ীদের নগদ প্রবাহ কমেছে যথাক্রমে ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। বাংলাদেশে নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩৭ শতাংশ অস্থায়ীভাবে ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে পুরুষ পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২১ শতাংশের ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে আইএফসি এই জরিপ সংক্রান্ত ওয়েবিনারের আয়োজন করে, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়, যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ ও ডেভেলপমেন্ট অফিস এবং বিশ^ব্যাংকের প্রতিনিধিরা প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর বলেন, অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। দেশের এমএসএমই খাতের অভ্যন্তরীণ অবস্থা জনসমক্ষে আনতে আইএফসির প্রচেষ্টা খুবই প্রশংসনীয়। খাতটি পুনরুজ্জীবিত করতে এ খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভর্তুকি সুদহারে ঋণ দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া রয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, চলতি জুন-আগস্ট সময়ে ৮০ শতাংশের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লোকসানের খতিয়ান প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ফ্যাশন ও পোশাক ব্যবসার জন্য পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। মহামারীর প্রভাবে এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে। জুন-আগস্ট সময়ে ফ্যাশন ও পোশাক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৬৫ শতাংশ।
বিশ^ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। খাতটিতে ২ কোটি বেশি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।
টেম্বন আরও বলেন, কভিড-১৯ মহামারীতে চাকরি ও আয় হারিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক। সেই সঙ্গে রয়েছে নিম্ন আয়ের পেশাজীবীরা। আগামী দিনগুলোয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে নারী পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এছাড়া তাদের সহজে ঋণপ্রাপ্তিতে যে সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৬ মাসও বিক্রি এবং চাকরিতে নেতিবাচক প্রভাব থাকবে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভবিষ্যতে বিক্রি বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না ৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের আইএফসি কান্ট্রি ম্যানেজার ওয়েন্ডি ওয়ার্নার বলেন, মুনাফার অংক সীমিত হওয়ায় মহামারীর আগেও বাংলাদেশের এ প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। করোনার কারণে এখন এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সমস্যায় পড়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এখনই বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখে এ খাত পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পথ খুঁজে পাবে। সংকট থেকে উত্তরণে তিনটি নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। এ তিনটি নীতি সহায়তা হলো- চিহ্নিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তারল্য স্থানান্তর, নতুন ঋণের জোগান ও ভর্তুকি সুদহারে ঋণ নিশ্চিত করা।
কভিড-১৯ সংকট মোকাবিলায় সহায়তার অংশ হিসেবে চলতি মূলধন বাবদ বাংলাদেশের গ্রাহক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে আইএফসি। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি টেকসই ও কর্মসংস্থান সুরক্ষায় ৮০০ কোটি ডলারের প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে আইএফসি।