প্লট বরাদ্দে অনিয়ম-বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (আরডিএ)। সর্বশেষ ৩১টি প্লট বরাদ্দে লটারি না করে জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের লোকজনের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আরডিএ আওতাভুক্ত এলাকায় বাড়ি আছে এমন ব্যক্তিদেরও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্লট। জালিয়াতির মাধ্যমে দেড় কাঠার প্লট সীমা বাড়িয়ে করা হয়েছে তিন থেকে ছয় কাঠা পর্যন্ত। এমন বেশকিছু অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। এছাড়া প্লট বরাদ্দের নথি সংগ্রহে অভিযান চালিয়েছেন আরডিএ দপ্তরে। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, আরডিএ’র আওতায় বনলতা বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের ১০ প্লট আরডিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেরাই ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। পরস্পরের যোগসাজশে ৩১টি প্লট বরাদ্দে বড় ধরনের জালিয়াতি করা হয়েছে। প্লটপ্রত্যাশী ১৫৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও লটারি হয়নি। প্রায় সব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পছন্দের লোকজনকে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের প্লট দেওয়া হয়নি। এমনকি কোন শ্রেণিতে তারা আবেদন করবেন সেটাও রাখা হয়নি।
এসব অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন গত ২৯ সেপ্টেম্বর আরডিএ’র প্লট বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দেয়। নোটিসে অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে লেখা হয়, ‘রাজশাহী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের প্লট বরাদ্দে পুকুর চুরিসহ অন্যান্য অভিযোগ।’ দুদকের ওই নোটিস পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন আরডিএ’র বেসরকারি সদস্য ও প্লট বরাদ্দ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ এন্তাজুল হক, মো. হাবীবুর রহমান বাবু, বেগম ইয়াসমিন রেজা ফেন্সী, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম ও সম্পত্তি কর্মকর্তা বদরুজ্জামান। এদের মধ্যে চারজন দুদকের নোটিস পেয়ে হাজির হয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা সবাই স্বীকার করেছেন, প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে লটারি করা হয়নি, বরং পছন্দের লোকজনকে প্লট দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, আরডিএ ২০১৩ সালে বনলতা আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় ১৯২টি প্লট বরাদ্দ দেয়। ওই সময় আরডিএ’র লোকজন ৫ শতাংশ কোটায় ১০টি প্লট বরাদ্দ নেয়। পরে একই এলাকায় ২০১৭ সালে ৩১ প্লটের মধ্যে ১০টি ভাগাভাগি করে নেয় আরডিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বাদবাকি প্লটগুলোও নিজেদের পছন্দমতো বিতরণ করে। আরডিএ ৩২টি প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দিলেও বরাদ্দ দেয় ৩১টি। প্লট বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী, আরডিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান বজলুর রহমান নিজেই নিয়েছেন ছয় কাঠার একটি কর্নার প্লট। চেয়ারম্যানের প্লট নম্বর-১৮৯ (সি)। প্লট বরাদ্দ কমিটির আহ্বায়ক ও আরডিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমলা রঞ্জন দাস বরাদ্দ নিয়েছেন পাঁচ কাঠার একটি প্লট। তার প্লট নম্বর-১১৭ (এ)। আরডিএ’র সম্পত্তি কর্মকর্তা ও প্লট বরাদ্দ কমিটির সদস্য সচিব বদরুজ্জামান নিয়েছেন ছয় কাঠার একটি প্লট, (প্লট নং-১৮৯ [এ])। আরডিএ’র প্রকৌশল শাখার কর্মচারী শামসুন্নাহার মুন্নীর নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লট। শুধু কর্মকর্তারাই নন, তারা নিজের গাড়িচালক ও অফিস সহকারীসহ অধীনস্থ কর্মচারীদেরও নামে-বেনামেও বরাদ্দ দিয়েছেন প্লট। আরডিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমলা রঞ্জন দাসের গাড়িচালক শরিফুল ইসলাম পেয়েছেন পৌনে দুই কাঠার প্লট। চেয়ারম্যানের পিয়ন ইউনুস আলী বরাদ্দ পেয়েছেন পৌনে দুই কাঠার প্লট। আরডিএ’র অথরাইজড অফিসার আবুল কালাম আজাদের পিয়ন রেজাউল করিম পেয়েছেন সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লট। সরকারি কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বরাদ্দ পেয়েছেন চার কাঠার প্লট। এভাবে প্লট নিয়েছেন আরডিএ’র আরও একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নিজের বা স্ত্রীর নামে আরডিএ’র আওতাভুক্ত এলাকায় কারও বাড়ি বা প্লট থাকলে তিনি প্লট পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। কিন্তু এ নিয়ম লঙ্ঘন করেন আরডিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান বজলুর রহমান। অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, বজলুর রহমানের পাঁচতলা বাড়ি আছে নগরীর তালাইমারী এলাকায়। সম্পত্তি কর্মকর্তা বদরুজ্জামানেরও বাড়ি আছে আরডিএ’র আওতাভুক্ত এলাকায়। এ ক্ষেত্রে তারা কীভাবে প্লট পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিতরা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল বনলতায় ৩২টি প্লটের বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। প্লট বরাদ্দের নোটিসে বলা হয়, যেসব শ্রেণি-কোটা অপূর্ণ রয়েছে, সেগুলোর প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। আবেদনের নির্ধারিত দিন ২৫ মে পর্যন্ত ৩২ প্লটের বিপরীতে ১৫৪টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। আবেদনকারীদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরাও ছিলেন।
অভিযোগ থেকে জানা গেছে, প্লট বরাদ্দের আবেদনপত্র জমার শেষ দিন ছিল ২০১৭ সালের ২৫ মে। ওই বছর ৩১ মে সকাল সাড়ে ৯টায় লটারি করা হবে বলে আরডিএ’র এক নোটিসে বলা হয়। ওই সময় আবেদনকারীদের আরডিএ ভবনে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। কিন্তু ওইদিন আরডিএ ভবনে লটারি অনুষ্ঠিত হয়নি। লটারি হবে জেনে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন, আরডিএ’র সম্পত্তি শাখা থেকে তাদের বলা হয় লটারি পরে করা হবে। এখন বরাদ্দ কমিটি বৈঠক করছে।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী আরডিএ’র প্লটগুলো ছিল দেড় কাঠার। সেখানে কর্মকর্তারা তিন ও ছয় কাঠার কেউ দুটি, আবার কেউ তিনটি পর্যন্ত প্লট বরাদ্দ নেন। তারা কোটা ও লটারিতে প্লট পাওয়ার দাবি করেন। এ ক্ষেত্রে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের প্রশ্ন ছিল, লটারি হয়ে থাকলে একজনের নামে কীভাবে দুই থেকে চারটি পর্যন্ত লটারি তারা পেয়েছে। যার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি আরডিএ’র তৎকালীন কর্মকর্তারা।
অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, প্লটের আয়তন কম হওয়ায় সম্পত্তি কর্মকর্তা বদরুজ্জামান নানা কৌশল খাটান। নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বড় আকারের প্লট বরাদ্দ দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই থেকে চারটি পর্যন্ত প্লট একত্র করে একটি প্লট করেন। আবার একই কর্মকর্তা দুটি বা তিনটি প্লট পেয়েছেন বলে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে দেন।
বনলতা বাণিজ্যিক এলাকার আলোচিত ৩১টি প্লট শ্রেণি ও ক্যাটাগরিভিত্তিক বরাদ্দের কথা নোটিসে বলা হলেও এ ক্ষেত্রে প্লট প্রাপ্ত আরডিএ’র শীর্ষ কর্মকর্তারা কোন ক্যাটাগরিতে প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রসপেকটাসে উল্লেখ করা ২ নম্বর শর্তের স্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, আরডিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একাধারে আরডিএ’র আবাসিক এলাকা পদ্মা, চন্দ্রিমা, মহানন্দা ও এর আগে বনলতার ১৯০ প্লট কোটার অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়েছেন। নিয়ম লঙ্ঘন করে নেওয়া এসব প্লট তাদের অনেকেই চড়া দামে বিক্রি করেও দিয়েছেন। এসব নিয়ে দুদকের তদন্ত চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অনুসন্ধান করছি। অভিযোগে অনেক কিছুই বলা আছে। এখনো আমরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি। তাছাড়া অনুসন্ধান চলমান থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আরডিএ’র বিদায়ী চেয়ারম্যান বজলুর রহমানকে দুদক দুই দফা নোটিস দিলেও তিনি কমিশনে হাজির হননি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে গতকাল সোমবার বজলুর রহমান মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনি কী বলতে চান আমি তা বুঝতে পারছি না।’