তিন বছরের বেশি সময় পার হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশি মিশনে পোস্টিং ইস্যুর সুরাহা হয়নি। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ থেকে সমহারে পোস্টিং দেওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা দেওয়া হচ্ছে না। তবে মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মিশনে পোস্টিং হচ্ছে নিয়মিত। এ কারণে জননিরাপত্তা বিভাগের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন। এতে উভয় বিভাগের দুই সিনিয়র সচিবসহ পাঁচজনকে বিবাদী করা হয়েছে। তবে সুরক্ষা সেবা বিভাগ বলছে, কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী মিশনে পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গত ১৪ সেপ্টেম্বর সুরক্ষা বিভাগ থেকে আরও চারজনকে মিশনে পোস্টিং দেওয়া হয়। জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে ১৯টি মিশনে পোস্টিং দেওয়ার কথা ছিল। উল্টো এখন ৭৩টি পদে সুরক্ষা বিভাগ থেকে এককভাবে পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়েও ক্ষোভ আছে অনেকের মধ্যে।
জননিরাপত্তা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া সিদ্ধান্তও মানা হচ্ছে না। এমনকি সমস্যা সমাধানের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চিঠি দেওয়া হলেও কার্যত কিছুই হয়নি। মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেও রহস্যজনক কারণে তা হচ্ছে না। ২০১৭ সালে দুটি বিভাগ সৃষ্টির পর মিশনে অংশগ্রহণের বিষয়টি না থাকায় একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতাবলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি নথি অনুমোদন করেন। ওই নথিতে বলা হয়েছিল, বিদেশে মিশনে জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে সমহারে নিয়োগ দিতে হবে। এরপর একই বছরের ১ মার্চ জননিরাপত্তা বিভাগের তৎকালীন সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ একটি পরিপত্র জারি করেন।
ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, পরিপত্রে বলা হয়েছিল, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা বিভাগ থেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমহারে নিয়োগ বা পদায়ন করার সুযোগ সৃষ্টি করা হলো। এ জন্য উভয় বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামোয় সমহারে পদায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে দুই বিভাগের সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কমিটি এ-সংক্রান্ত ২০১৪ সালের নীতিমালার ২.১, ৫.১, ৬.৮, ৭.১ এবং ১০.১ অনুচ্ছেদসহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
জানতে চাইলে সুরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, জননিরাপত্তা বিভাগের যে পরিপত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে, সেটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাতিল করার নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে ওই পরিপত্রের কোনো কার্যকারিতা থাকছে না। তারপরও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরাও চাচ্ছি বিষয়টির সুরাহা হোক।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে ১৯টি মিশনে তিন ক্যাটাগরিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ৭৩টি পদ রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম শ্রেণির পদ আছে ১৯টি। যেখানে ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় সচিব হিসেবে প্রথম শ্রেণির পদে পদায়ন করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দ্বিতীয় শ্রেণির ১০টি ও তৃতীয় শ্রেণির রয়েছে ৪৪টি পদ। স্বামী-স্ত্রী, দুই সন্তানসহ চার বছর মেয়াদি এসব পোস্টিং পেতে অনেকে অপেক্ষায় থাকেন। যেসব দেশে মিশনে পোস্টিং দেওয়া হয় সেগুলো হচ্ছেÑ সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতারের দোহা, কুয়েত, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, ইতালি, জর্ডান, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটন, যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও বার্মিংহাম, কানাডার অটোয়া, হংকং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া। মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে মিশনে পোস্টিং পেতে পারেন সে জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে চিঠি দিয়ে আলোচনা করে সৃষ্ট বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে বলা হয়। গত ১৮ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা অধিশাখা থেকে আরেকটি চিঠি দেওয়া হয় দুই সচিবকে। ওই চিঠিতে বলা হয়, জননিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চতর আদালতে একটি রিট আবেদন করেছেন। সে জন্য বৈদেশিক মিশনে পদায়নের জন্য জারি হওয়া পরিপত্র অনুসারে নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করে বা রিটের শুনানি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মিশনে নিয়োগ বন্ধ রাখতে বলা হয়।
জননিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জননিরাপত্তা বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নথি উপস্থাপন করা হলে তা আটকে দেওয়া হয়। গত ২২ জুলাই করোনার সময়েও মিশনের স্থায়ী পদে নিয়োগের জন্য সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। যেখানে জননিরাপত্তা বিভাগের কাউকে পদায়নের সুযোগ রাখা হয়নি। এসব কারণে ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। তারপরও গত ১৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া ও লন্ডনে একজন করে এবং চারজনকে জর্ডান ও বাহরাইনে পোস্টিং দেওয়া হয়। বর্তমানে জননিরাপত্তা বিভাগে ৫ হাজার ৪৪৩ জনের বিপরীতে সুরক্ষা বিভাগে ১ হাজার ১৮৪ জনবল কাজ করছে।
সুরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীনে। আর এসব কারণে আমাদের বিভাগ থেকে মিশনে পদায়ন করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় বিভক্ত হওয়ার সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি হওয়া গেজেটের বি-২(১) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পাসপোর্ট ও ভিসা উইং সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের আওতাধীন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের অফিসগুলোতে কনস্যুলার সার্ভিস শাখায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, ইআরডি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিচ্ছে।’