আফগান যুদ্ধে জেনারেলদের দলবদল

প্রায় দুই দশক ধরে চলছে আফগানিস্তানের যুদ্ধ। মার্কিন বাহিনী যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও বিবদমান প্রধান দুই প্রতিপক্ষ তালেবান ও আফগান সরকারি বাহিনী এখনো মুখোমুখি অবস্থানে। এই যুদ্ধে অনেকেই মিত্র থেকে দুর্ধর্ষ শত্রুতে পরিণত হয়েছেন, শত্রু হয়ে গেছেন মিত্র। লিখেছেন পরাগ মাঝি

তালেবান কমান্ডার থেকে সরকারি মুখপাত্র

দুর্ধর্ষ এক তালেবান কমান্ডার ছিলেন রহমতুল্লাহ আন্দার। আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে তিনি মার্কিন ও আফগান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। কিন্তু ২০০৭ সালে আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশের একটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে মার্কিন স্পেশাল অপারেশন টিম। পরে তাকে কাবুলের কাছাকাছি বাগরাম এয়ার বেসে মার্কিন সেনাদের পরিচালিত একটি কারাগারে রাখা হয়। এই কারাগারে টানা দুই বছর বন্দি ছিলেন রহমতুল্লাহ।

বর্তমানে রহমতুল্লাহর গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। দুর্ধর্ষ তালেবান কমান্ডার থেকে এখন তিনি আফগানিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তালেবান যোদ্ধা থেকে বিরোধী শিবিরের উচ্চপদে আসীন হওয়ার এই গল্পটি অন্তহীন আফগান যুদ্ধের এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

১৯ বছর ধরে চলমান আফগান যুদ্ধের প্রায় অর্ধেক সময় তালেবান কমান্ডার হিসেবে পরিচিত রহমতুল্লাহ ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো তালেবানদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র চালাতে শুরু করেন। তার এই দলবদলকে তালেবানরা সহজভাবে নেবে না, এটা আগেই অনুমান করা হয়েছিল। রহমতুল্লাহর ওপর প্রতিশোধ নিতে এখন পর্যন্ত তার ৭৫ বছর বয়সী বাবা, এক চাচা ও দুই চাচাতো ভাইকে হত্যা করেছে তালেবান যোদ্ধারা। শুধু তা-ই নয়, সুযোগ পেলে রহমতুল্লাকেও যে তারা নির্মমভাবে হত্যা করবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সাবেক সহকর্মীদের কাছেই তিনি এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু।

দুটি মাস্টার্স ডিগ্রিসহ ধর্ম বিষয়ে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ৪১ বছর বয়সী রহমতুল্লাহ কাবুলের রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ থেকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাকে হত্যা করার জন্য তালেবানরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি সরকারের সঙ্গে থাকি আর না থাকি, সুযোগ পেলেই তারা আমাকে জীবিত থাকতে দেবে না।’

পশতু, পার্সিয়ান এবং ইংলিশ তিন ভাষাতেই কথা বলতে পারেন রহমতুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে তালেবানদের অপহরণ প্রচেষ্টা, হামলা ও মার্কিন বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তার লম্বা চুল, দাড়ি ও বেশভূষা দেখে এখনো অনেকেই তালেবান বলে ভুল করতে পারেন। তবে তালেবানদের এখন তিনি মন থেকেই ঘৃণা করেন। যারা ভুল পথ ছেড়ে সঠিক পথের অনুসন্ধান করছেন, তাদের কাছে নিজেকে এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দাবি করেন তিনি।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র হিসেবে রহমতুল্লাহকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি নিজের মুখেই মুখপাত্র হিসেবে রহমতুল্লাহর নাম ঘোষণা করেন। একজন মৌলভি হিসেবে সুখ্যাতি এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রহমতুল্লাহকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। তার এই পদায়নের মাধ্যমে আফগান সরকার একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে বিরোধীদের। তালেবানরা প্রায় সময়ই এই সরকারকে ইসলামবিরোধী এবং আমেরিকার পুতুল সরকার হিসেবে আখ্যা দেয়। একজন মৌলভিকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে এমন অপবাদ কিছুটা মুছে ফেলতে চেয়েছেন আশরাফ ঘানি সরকার।

তবে, একটি মাত্র নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের ইসলামবিদ্বেষী তকমা মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন রহমতুল্লাহ। তার মতে, বর্তমান সরকার আরও অনেক কিছু দেখাতে সক্ষম।

রহমতুল্লাহ দাবি করেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেনা প্রত্যাহার চুক্তির পর নিরীহ আফগান ও সাধারণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে তালেবানদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এমনকি আফগান সরকারের ইসলামিক বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও তালেবানদের নেই। কিন্তু তালেবানরা এখন চুক্তির বাইরে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কাফের হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তারা আবারও দেশটিতে শরিয়া আইন প্রবর্তনের দাবি জানাচ্ছে। আফগানিস্তানের নারীরা আবারও তালেবান শাসন ফিরে আসার ভয়ে আছে। কিন্তু তালেবানরা নারীদের ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিতে চায়, সেগুলো কিছুতেই ইসলামসম্মত নয়।

রহমতুল্লাহ সম্পর্কে গজনি প্রাদেশিক কাউন্সিলের ডেপুটি আমানুল্লাহ কামরান জানান, তালেবানরা রহমতুল্লাহর পরিবারের প্রায় সব পুরুষকেই হত্যা করেছে। যুদ্ধের সময়গুলোতে সব সময় একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করলেও নিজের নিরাপত্তার জন্য এখন শুধু একটি পিস্তল সঙ্গে রাখেন রহমতুল্লাহ।

আফগান জেনারেল থেকে তালেবান

এই গল্পটি নামকরা একটি আফগান পরিবারের বিভক্তির উপাখ্যান। আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফারাহ প্রদেশের পুলিশ প্রধান ছিলেন জেনারেল আবদুল জলিল বাখতোয়ার। তালেবান যোদ্ধারা তাই সব সময় তার নির্মম মৃত্যু কামনা করত। অবসর গ্রহণ করলেও যুদ্ধের ময়দান থেকে তিনি কখনোই সরে আসতে পারেননি। তাকে মেরে ফেলার জন্য বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীও পাঠিয়েছিল।

আবদুল জলিলের দুই ছেলের মধ্যে মাসুদ বাখতোয়ার ফারাহ প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর। আর ফরিদ বাখতোয়ার ছিলেন প্রাদেশিক কাউন্সিলের প্রধান নেতা। কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান-বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান ফরিদ। তার লাশটিকে বেশ কয়েক দিন আটকে রেখেছিল বিদ্রোহীরা। পরে মুক্তিপণ দিয়ে লাশটিকে ফেরত আনা হয়। এত কিছুর পরও গত মে মাসের প্রথমার্ধে আফগান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে তালেবানদের সঙ্গেই যোগ দেন জেনারেল আবদুল জলিল।

এই দলত্যাগের ঘটনায় আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তারিক আরিয়ান বলেন, ‘আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতার শত্রুদের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল যোগদান করায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। মর্যাদার জীবন ছেড়ে তিনি বিশৃঙ্খলাকেই বেছে নিয়েছেন।’

বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও ফারাহ প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর মাসুদ বাখতোয়ার এক বিবৃতিতে তালেবানদের সঙ্গে জেনারেল আবদুল জলিলের যোগদানের ঘটনাটিকে ভুয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, নিজের এলাকায় দুটি উপজাতি গোত্রের মধ্যে বিবাদের মীমাংসা করতে গেলে তার বাবকে নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

কিন্তু তালেবানদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার মুহূর্তে জেনারেল আবদুল জলিল বাখতোয়ারের কয়েকটি ছবিও প্রকাশ করে বিদ্রোহীরা। ছবিগুলোতে দেখা যায় মাথায় একটি পাগড়ি পরেছেন তিনি। গলায় ঝুলছে ফুলের মালা। আর তার চারপাশে অবস্থান করছেন তালেবান যোদ্ধারা। তাদের সবার হাতে তালেবান সাদা পতাকা। শুধু তা-ই নয়, যোগদান অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওতে শোনা যায়, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আবদুল জলিল একটি মসজিদের ভেতর দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘যদি ইসলামিক সরকার কায়েম হয় তাহলেই সবচেয়ে ভালো হবে। শুধু এটাই পারে রক্তপাত বন্ধ করতে।’ মসজিদের ভেতরেও সাদা পতাকা হাতে তালেবানদের উপস্থিতি দেখা গেছে। যোগদানের মুহূর্তটিতে তালেবান যোদ্ধারা সমস্বরে তাদের ঐতিহ্যবাহী স্লোগান দিচ্ছিল।

ঠিক কী কারণে জেনারেল আবদুল জলিল তার সাবেক শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ঘটনার পর থেকেই তার ফোনটি বন্ধ রয়েছে। তবে ফারাহ প্রদেশের সাংসদ সামিউল্লাহ সামিম দাবি করেন, অবসর গ্রহণের পর থেকেই তালেবান যোদ্ধারা জেনারেল আবদুল জলিল ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে তিনি কোনো সহায়তা পাননি। অবসরে যাওয়ার পর তিনি স্থানীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হন এবং টানা কয়েক বছর নিজ গোত্রের মানুষদের সংঘবদ্ধ ও অস্ত্রসজ্জিত করে সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু সরকারি সহযোগিতা না থাকায় তার সঙ্গীরা প্রায় সময়ই বিদ্রোহীদের আক্রমণের শিকার হতে থাকে।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে ফারাহ প্রদেশ থেকে সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আবদুল জলিল বাখতোয়ার। নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত ফলাফলগুলোতে তিনি এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায় তিনি পরাজিত হয়েছেন। জেনারেলের সমর্থকরা তো বটেই, সাধারণ মানুষরাও এই নির্বাচনী ফলাফলে কারচুপি করা হয়েছে বলে দাবি তোলেন। সামিউল্লাহ সামিম বলেন, ‘কমান্ডার জলিল দেশের জন্য বেশ কয়েক বছর যুদ্ধ করেছে অথচ তার পরিবার ও গোত্রের মানুষদের বাঁচাতে সরকার এগিয়ে আসেনি। তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তার নির্বাচনটিও সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ হয়নি। কমান্ডার বিশ্বাস করেন, সরকার তার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে।’

ফারাহ প্রদেশের কাউন্সিল সদস্য দাদুল্লাহ কানি জানান, অবসর নেওয়ার পরও জেনারেল আবদুল জলিল তালেবানদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের শিবিরে যোগ দেওয়ার আগে তালেবানরা জেনারেলের মাথার মূল্য নির্ধারণ করেছিল ১০ হাজার ডলার।

বাবা-ছেলের শত্রুতা ও মৈত্রী

আবদুল বশির ছিলেন আফগান সরকারি সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার। কিন্তু তার ছেলে সাঈদ মুহাম্মাদ যোগ দিয়েছিলেন তালেবানদের সঙ্গে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাই একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র চালাতেন তারা। কিন্তু ২০১৬ সালের আগস্টে পরিস্থিতি বদলে যায়। তালেবান যোদ্ধাদের পক্ষ ত্যাগ করে বাবার কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আফগান শিবিরে যোগ দেন সাঈদ। ফলে বাবা-ছেলে দুজনের অস্ত্রই একসঙ্গে গর্জে ওঠে তালেবান শিবিরের বিরুদ্ধে। একই যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতেন তারা।

বাবা-ছেলের মিলনের এক মাস পর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় ফারিয়াব প্রদেশের কায়সার জেলায় নিজ বাড়ির কাছেই আরও ১০ জন সহযোদ্ধাসহ বিদ্রোহী তালেবান যোদ্ধাদের ফাঁদে পড়ে যান তারা। অন্তত কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর নিজেদের পাঁচ সৈন্যসহ ঘটনাস্থলেই নিহত হন সাঈদের বাবা বশির। তবে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন সাঈদ।

বশিরসহ নিহত অন্য পাঁচ সৈনিকের লাশ ট্যাংকের পেছনে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে ১০ কিলোমিটার দূরে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে যায় তালেবান যোদ্ধারা। পরে স্থানীয় বয়স্ক নেতাদের হস্তক্ষেপে লাশগুলো কায়সার জেলার কেন্দ্রে বশিরের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত নিজের গ্রাম জিয়ারতগাহ ছেড়ে একসময় কায়সার শহরেই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন বশির। তার শরীরে সাতটি বুলেট বিদ্ধ হয়। এর মধ্যে একটি বুলেট তার মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়।

বশিরের জানাজায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ সমবেত হয়। নিজের গ্রাম জিয়ারতগাহ থেকে যারা তার জানাজায় এসেছিলেন, তাদের প্রতি তালেবানরা এই বলে হুমকি দেয় যে, যদি তারা বশিরের জানাজায় অংশ নেয়, তবে তাদের কাউকে জিয়ারতগাহ গ্রামে ফিরতে দেওয়া হবে না। তাই বশিরের কয়েক ডজন আত্মীয়-স্বজন তার মৃত মুখটি দেখে জানাজা শুরু হওয়ার আগেই ওই স্থান ত্যাগ করে গ্রামে চলে যায়।

তালেবানদের পক্ষে থাকা অবস্থায় সাঈদ মুহাম্মাদ একসময় নিজের বাবা বশিরকে কাফের ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তালেবানদের হত্যা করার জন্য উন্মত্ত হয়ে ওঠেন তিনি। তার পুরনো সহযোদ্ধারাই এখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু।

বাবার মৃত্যুর পর সাংবাদিকদের কাছে সাঈদ বলেছিলেন, ‘ভেবেছিলাম আমার মৃত্যু হবে, আমার বাবার নয়। তালেবানরা সত্যিই তাকে জমের মতো ভয় পেত। আমি তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। যারা তাকে মেরেছে তাদের ছিন্ন মাথা এই কায়সার বাজারে না আনা পর্যন্ত আমি থামব না।’

জানা যায়, কয়েক দশক ধরে সাবেক আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবদুল রশিদ দস্তামের সৈন্যদলে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করেছেন আবদুল বশির। পরে তিনি এই সৈন্যদলে কমান্ডারের দায়িত্ব পান। ৯০-এর দশক থেকে কায়সার জেলার মৌলভি হাফিজ নামে এক ধর্মীয় নেতা ছিলেন তার প্রধান শত্রু। মৌলভি হাফিজ একসময় ফারিয়াব প্রদেশে তালেবানদের হয়ে যুদ্ধ করেছেন। পরে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালালে তিনি যুদ্ধ ছেড়ে ধর্ম-কর্মে মন দেন। কিন্তু বশিরকে শায়েস্তা করার জন্য তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। পরে বশিরের ছেলে সাঈদকে তিনি হাতের নাগালে পেয়ে যান এবং তাকে উগ্র ধর্মীয় শিক্ষায় প্রভাবিত করেন। মৌলভি হাফিজ সাঈদকে তালেবান যোদ্ধায় পরিণত করে বাবাকে হত্যার লক্ষ্য দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে পাঠান। টানা কয়েক বছর বাবা-ছেলে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে মিলিত হলেও এক মাসের মধ্যেই প্রাণ হারান বাবা বশির। তাই অনেকে সাঈদকেও সন্দেহের তালিকায় রাখেন।

বশির নিহত হওয়ার পর ফারিয়াব প্রদেশের পুলিশপ্রধান কায়সারি বলেছিলেন, ‘বাবা-ছেলের গল্পে অনেক টুইস্ট আছে। গল্পটি এখনো যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। বাবার হত্যাকাণ্ডে ছেলের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা আমরা খতিয়ে দেখব।’

নিজের বেঁচে যাওয়া প্রসঙ্গে সাঈদ দাবি করেছিলেন, তাদের দলটিকে অন্তত ৫০০ তালেবান যোদ্ধা ঘেরাও করেছিল। ঘেরাও থেকে বের হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় একসময় তিনি তার বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং গ্রেনেড চার্জ করতে করতে বেরিয়ে আসেন।