আলুর দাম ও সরকারের উদ্যোগ

আলুর মধ্যে কীরকম যেন একটা শান্ত, নিরীহ, ভদ্র এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাপার আছে। তুলনায় অন্য সব তরকারির কত রং, কত বাহার, কত স্বাদ, কত বিচিত্র ভাবভঙ্গি। দাঁত থাকতে যেমন মানুষ দাঁতের মর্ম বোঝে না, সেই রকম আকাল না হলে আলুর গুণের কদর হয় না। সেই আলু নিয়ে দেশজুড়ে হাহাকার। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সত্ত্বেও কয়েকদিন ধরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে আলুর বাজারে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে এই নিত্যখাদ্যপণ্যটির দাম।

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি বহুল প্রচলিত। অথচ ‘আলু-ভাতে বাঙালি’-ই আমাদের জীবনে অনেক বেশি সত্যি। হতদরিদ্র থেকে উচ্চবিত্ত, প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আলু নেই, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। ভর্তা থেকে ডাল, তরকারি থেকে ডালনা, ঝোল আর ঝাল, এমনকি বিরিয়ানিও, সবই আলু দিয়ে! সেই আলুর দাম যখন চড়চড়িয়ে বাড়তে থাকে, তখন অবস্থা কেমন হয়, তা সহজেই অনুমেয়।

আলু নিয়ে এই ফাটকাবাজি আমাদের দেশে নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর বর্ষার সময় বা তার অব্যবহিত পরে যখন প্রকৃতির নিয়মেই বাজারে অন্যান্য সবজির জোগান কমে আসে, ঠিক সেই সময়ে মজুদদাররা কৃত্রিমভাবে আলু-পেঁয়াজের দাম হুট করে বাড়িয়ে দেন। এ বছরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথমে পেঁয়াজ, এরপর আলুর দাম বেড়ে গেছে। যে রকেট-গতিতে পেঁয়াজের দাম উঠছে, তাতে কোথায় গিয়ে থামবে, বলা মুশকিল।

চলতি বছর দীর্ঘমেয়াদি বন্যার কারণে দেশের অধিকাংশ জেলায় সবজি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে সব ধরনের সবজির দাম চড়া। এ অবস্থায় সবজি হিসেবে আলুই ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা। কিন্তু এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পণ্যটির বাজার অস্থির করে তুলেছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। উৎপাদন মৌসুমে কৃষকরা প্রতি কেজি আলু ১২-১৫ টাকায় বিক্রি করেছেন। সেই আলু কিনে মজুদ করেন হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা, যা এখন হিমাগার গেইটে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকার বেশি দামে। ৬০ কেজির এক বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণে তাদের খরচ পড়ে ১৮০-২২০ টাকা। ক্রয়মূল্য, হিমাগার খরচ ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতি বস্তা আলুতে মোট খরচ হয় ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। কিন্তু সেই আলু এখন ২ হাজার ১০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি করছেন হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

আলুর দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এ বছর আলুর বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরা। এক কেজি আলুতে ২০ টাকা লাভ করছেন তারা।

আলুর দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার খুচরা পর্যায়ে আলুর সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য ৩০ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ ছাড়া টিসিবির মাধ্যমে ২৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আলু ব্যবসায়ীদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অধিক দামে আলু বিক্রির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। যদিও এসব উদ্যোগের সুফল খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। যে কোনো সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং তার সমাধান বার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা একটা বড় ধাপ। কিন্তু কর্মপন্থা কী, সেটা নিয়ে ভালো করে না ভেবে ‘কিছু তো একটা করতে হবে’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়লে সমস্যার সমাধান হবে, না হিতে বিপরীত হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

কোনো কিছুর দাম চড়চড় করে বাড়লে মনে হতে পারে, দামটার ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিলেই সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু এতে আসল সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং উল্টো ফল হবে। খুচরা বিক্রেতারা যে দামে আড়তদারদের কাছে কিনেছেন, তার থেকে কম দামে বিক্রি করলে তাদের ক্ষতি হবে, জীবনধারণ কঠিন হবে, ফলে কেন তারা এতে রাজি হবেন? মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে যেমন যাওয়া যায় না, সেই রকম হুকুম করে বা হম্বিতম্বি করে চাহিদা ও জোগানের লৌহকঠিন নিয়মের ঊর্ধ্বে যাওয়া যায় না। যে কোনো পণ্যের কোনো কারণে জোগান কমলে বা উৎপাদনের খরচ বাড়লে, বাজারে দাম বাড়বে। সেখানে জোর করে বাজারদরের থেকে কম দাম বেঁধে দিলে, জোগান কমবে। সেটা আটকানোর সহজ কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না।

যাদের সুবিধার্থে এই হস্তক্ষেপ, অর্থাৎ ক্রেতারা, তাদেরও কোনো লাভ হচ্ছে না। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার আলুর দাম বেঁধে দেওয়ার পর থেকে বাজার থেকে আলু উধাও, অথবা পচা, পুরনো আলু পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি দরে যে আলু আসছে, তা চাহিদার তুলনায় নেহাতই নগণ্য, আবার কোথাও ক্রেতারা এর দেড় থেকে তিন গুণ দামে আলু কিনছেন।

এর অন্য অসুবিধাও আছে। একবার, দুবার কোনো খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে জোর করে কম দামে আলু কেনা যেতে পারে, কিন্তু বারবার তা করা যাবে না; তিনি আলু বেচা বন্ধ করে দেবেন। তাই নৈতিকতার কথা যদি বাদও দিই, এই নীতি বাস্তবসম্মত নয়। জোর জবরদস্তি করলে জোগান কমবে বা বন্ধ হয়ে যাবে।

তাই, সারা দিন ধরে দেয়াল দুহাত দিয়ে ঠেললে বা ফুটো পাত্রে জল আটকাবার চেষ্টা করলে যেমন অনেক পরিশ্রম হয় কিন্তু কাজের কাজ হয় না, সেই রকম সরকার বা প্রশাসনের প্রতিনিধিদের বাজারে বাজারে ঘুরে আলুর দাম রোখার চেষ্টার মধ্যে সদিচ্ছা এবং পরিশ্রম থাকলেও, মূল উদ্দেশ্য সিদ্ধির কোনো সম্ভাবনাই নেই।

এবার এই চাহিদা-জোগানের সহজ সরল গল্পের একটু বাইরে যেতে হবে, কারণ আলু হিমাগারে মজুদ করে রাখা যায়, এবং ক্রেতা আর উৎপাদকের মধ্যে খুচরা বিক্রেতাদের ছেড়ে আড়তদার এবং ব্যবসায়ীদের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। খুচরা বাজারে ক্রেতা আলুর যে দাম দেন, তার খুব অল্পই একটা অংশ আলুর চাষি বা খুচরা বিক্রেতারা পান। অধিকাংশই যায় আলুর ব্যবসায়ী (যাদের ফড়িয়া বলা হয়) এবং আড়তদারের কাছে। আলু উৎপাদনের পর্যায় থেকে মানুষের রান্নাঘরে যাওয়ার মধ্যে অনেকগুলো ধাপ আছে, যাতে তার মূল্য যুক্ত (ভ্যালু অ্যাড) হয়, তাই ফড়িয়া এবং আড়তদারের প্রয়োজনীয় ভূমিকা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটা ধরেও একটা বড় অঙ্কের লাভ যে মধ্যবর্তী এই শ্রেণির কাছে যায়, তা অনস্বীকার্য। তাছাড়া আলুর বাজারদরের ওঠানামার ক্ষেত্রে ফাটকাবাজির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। যখন কোনো বাহ্যিক কারণে চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্য হয়, যেমন এই ক্ষেত্রে অত্যধিক বৃষ্টির জন্য হয়েছে, তখন খুচরা বাজারে দাম বাড়তে থাকে, এবং আরও বাড়বে এই আশায় ফাটকাবাজির কারণে বাজার থেকে আলু উধাও হয়ে যায়।

এই মুহূর্তে খুচরা বাজারে আলু দুষ্প্রাপ্য হলেও, হিমঘরে কিন্তু প্রচুর আলু মজুদ আছে। কোনো কিছুর দাম যখন বাড়ছে, পাঠ্যবইয়ের অর্থনীতির যুক্তি বলে, তার জোগান তখন বাড়বে এবং চাহিদা কমবে। বাস্তবে কিন্তু এটাই একমাত্র চালিকাশক্তি নয়, আড়তদার এবং ফাটকাবাজরা ভবিষ্যতে আরও বেশি লাভের আশায় সেই পণ্য মজুদ করে রাখবেন, তাই স্বল্পমেয়াদে তার দাম আরও বাড়বে এবং মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা কোনো কারণে জোগানের অভাব হলে তার থেকে লাভ করবেন। বাস্তব ঘটনাও তাই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৭০-৭৫ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সবজিপণ্যটির উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ টনেরও বেশি, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। তাই সরকারি হস্তক্ষেপের লক্ষ্য হওয়া উচিত খুচরা ব্যবসায়ী নয়, আড়তদার। প্রশাসন যে এই ব্যাপারে অবহিত নয় তা নয়, কিন্তু এর একটা রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। যতই হোক, বড় আড়তদার, ফড়িয়া এবং হিমঘরের মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।

তা হলে কী করণীয়? স্বল্পমেয়াদে সরকারের তরফে হিমঘর থেকে আলুর জোগান বাড়ানোর চেষ্টা করা দরকার। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হলে, আলুর বাজারে ব্যবসায়ী এবং আড়তদারের যে একচেটিয়া ক্ষমতা আছে তা কমাবার চেষ্টা করতে হবে। চাষিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তিনটে : এক, ঋণের অভাব; দুই, কোন বাজারে কী দাম, সেই বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য তার নাগালে থাকে না; তিন, খুচরা বাজার তার পক্ষে যথেষ্ট অধিগম্য নয়। এসব দুর্বলতার কারণেই ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের এত রমরমা। বিপণনের উদ্দেশে সংগঠিত চাষিদের সমবায়, চুক্তি চাষ এবং কৃষিজাত পণ্যের খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে বহিরাগত প্রতিযোগিতা বাড়ালে চাষিদের লাভ হবে, আখেরে ক্রেতাদেরও লাভ হবে।

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com