তিন প্রজন্ম ধরে লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল টোকিওতে বাস করছে কিটো পরিবার। জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়তে সময় লাগলেও মোচি নামের মিষ্টি খাবার তাদের জনপ্রিয় করে তুলেছে। জাপানি-আমেরিকান সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার তারা। কীভাবে খাবার তৈরির মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে তারা টিকে আছেন সেই গল্প লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
কিটো পরিবার ও ফাজেতসু-ডু
প্রতিদিন সকাল ৬টায় যখন বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, ব্রায়ান কিটো তখন মন্টেরি পার্কে নিজের ঘর ছেড়ে চলে আসেন লস অ্যাঞ্জেলেসের ইস্ট ফার্স্ট স্ট্রিটে নিজের দোকানে। এখানে অনেকগুলো দোকানের নামই ইংরেজিতে লেখা, বেশিরভাগই জাপানি ভাষায়, শুধু একটিমাত্র দোকানের জানালায় বড় বড় অক্ষরে ইংরেজি অক্ষরে জাপানি উচ্চারণে লেখা ‘ফাজেতসু-ডু’ (Fugetsu-Do) । লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল টোকিও (ঐতিহাসিক জাপানি-আমেরিকান এলাকা) এলাকার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো কনফেকশনারি দোকান এটি। ১৯০৩ সাল থেকে দোকানটি পরিচালনা করে আসছে কিটো পরিবার। পারিবারিকভাবে পরিচালিত এই দোকানে বেশ কয়েকটি তাক রয়েছে। যেগুলোতে সাজানো আছে জাপানি নানা মিষ্টি আর বিদেশি স্ন্যাকস। নিস্তব্ধ সকালে দোকানে এসেই কাজ শুরু করেন ব্রায়ান। পরের আট ঘণ্টা ছয়জন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। তারা সবাই মিলে বিখ্যাত যে খাবারটি বানান তার নাম ‘মোচি’। প্রচুর পরিমাণ চাল একসঙ্গে মিশিয়ে, রান্না করে, রোল বানিয়ে এবং র্যাপ করে সেই আঠালো চাল দিয়ে ২০ ধরনের স্টিমড রাইস কেক বানানো হয়। জাপানের অন্যতম বিখ্যাত একটি মিষ্টি খাবার মোচি। রান্নাঘরের কাজ শুরু হওয়া মাত্র ব্রায়ানের তদারকি বেড়ে যায়। একইসঙ্গে রান্নাঘরের কাজ দেখা আর গ্রাহক এলে তাকেও অভিবাদন জানানোর কাজটি তিনিই করেন। কুকার থেকে বাষ্প বের হতেই কর্মীরা আবার কাজ শুরু করে দেন, ব্রায়ান নির্দেশ দেন কোনটার পর কোনটা করতে হবে। ব্রায়ানের আগে ঠিক এভাবেই কাজ করতেন তার বাবা ও দাদা। শহরের বিভিন্ন দোকানে তাদের বানানো রাইস কেক সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রায়ান একদম ঘড়ি ধরে কাজ করেন। এরপর প্রস্তুতি নেন সারা দিনে তার দোকানে আসা গ্রাহকদের জন্য।
ব্রায়ান তৃতীয় প্রজন্মের জাপানি-আমেরিকান। তার পরিবারই মূলত মোচি তৈরির এই ধারাটি টিকিয়ে রেখেছে সেই ১৯০০ সালের শুরু থেকে, যখন বহু জাপানি লিটল টোকিওতে অভিবাসী হয়ে আসেন। বর্তমানে এই পাঁচটি ব্লকের প্রতিবেশীরা আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম একটি অংশ। সবাই জাপানি-আমেরিকান সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। কিটোর পারিবারিক ইতিহাসে এই লিটল টোকিওর অনেক বেদনাদায়ক গল্প আর জাপানি-আমেরিকানদের অভিজ্ঞতা লুকিয়ে আছে। ১৮৮২ সালের চীন বহিষ্কার আইন অনুযায়ী আমেরিকায় চীনাদের প্রবেশ বন্ধ হয়ে গেলে প্রচুর সংখ্যক জাপানি লস অ্যাঞ্জেলেসে এসে অল্প বেতনে কাজ শুরু করে। ইস্ট ফার্স্ট স্ট্রিট লস অ্যাঞ্জেলেসের জাপানিদের সংঘবদ্ধ সর্বপ্রথম সম্প্রদায়। ধীরে ধীরে জাপানিদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তারা নিজেরাই ছোট ছোট ব্যবসা ও উপাসনালয়গুলোতে খাবার দেওয়ার মাধ্যমে উপার্জন শুরু করেন।
ব্রায়ানের দাদা সিচি কিটো আমেরিকায় আসেন ১৯০৩ সালের মে মাসে। বসবাস শুরু করেন এই লিটল টোকিওতেই। নিজ দেশের টোকিওতে তিনি মোচি কারিগর ছিলেন। দেশ ছেড়ে এলেও সেখানে তৈরি খাবার দিয়েই চেষ্টা করতে লাগলেন অর্থ উপার্জনের। বর্তমানে যেখানে ফাজেতসু-ডু এর অবস্থান, সেটি সিচি তার বন্ধুদের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছিলেন। সিচি যখন মোচি বানাতেন, স্ত্রী তেই তখন দোকানের গ্রাহকদের সামলাতেন, বাচ্চারা মিষ্টি প্যাকেট করে দিতে সহায়তা করত। সিচির ছোট্ট দোকান ধীরে ধীরে স্থানীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মোচির পরিচিতি এত ছড়িয়ে যায় যে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সিচির বানানো মোচি আর রেড বিন দিয়ে বানানো মানজু রাইস কেক খেতে মানুষ চলে আসত দোকানে।
১৯২৪ সালের অভিবাসন আইন অনুযায়ী আমেরিকায় এশিয়ানদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে অনেকেই আর আসতে পারেননি। কিন্তু ১৯৩০ সাল নাগাদ লিটল টোকিওতে এত সংখ্যক জাপানি চলে এসেছিলেন যে, সেটি তখন আমেরিকায় জাপানের সবচেয়ে বড় পাড়া হয়ে উঠেছিল। আর ফাজেতসু-ডু ততদিনে ক্যালিফোর্নিয়ার জাপানি-আমেরিকান এই সমাজে ইট-সিমেন্ট দিয়ে দালানও তৈরি করে ফেলেছে।
জাপানিরা সাধারণত রাইস কেক খেতে বেশ ভালোবাসে। কিন্তু বিশেষ দিনগুলোতে এই খাবারটি উপহার হিসেবে দেওয়ারও প্রচলন আছে। মোচি ও মানজু সাধারণত উপহার হিসেবে দেওয়া হতো বছরের প্রথম দিন, মেয়ে দিবস (৩ মার্চ) এবং ছেলে দিবসে (৫ মার্চ)। নিউ ইয়ারের সময় কিটো পরিবারের রান্নাঘরে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যেত। মোচি আর মানজু কেক বানানোর জন্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হতো। লিটল টোকিওর যারা স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন তারা অবশ্য যথেষ্ট সাহায্য করেন এ সময় সবার চাহিদা অনুযায়ী মিষ্টি দেওয়ার জন্য। ব্রায়ান বলেন, ‘মোচি আমাদের ধর্ম আর সংস্কৃতির সঙ্গে যেমন মিশে আছে, তেমনি পেস্ট্রিও এখানে খুব সহজে পাওয়া যায়। আমার দাদা সব সময় লিটল টোকিওর ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। কীভাবে প্রতিবেশীদের খেয়াল রাখা যায় তার নতুন নতুন পদ্ধতি বের করতেন।’
কঠিন সময় পাড়ি
সিচির ছেলে রয়েরও মোচি তৈরিতে আগ্রহ জন্মে। ১৯৩৫ সাল থেকে তিনি বাবার সঙ্গে কাজ শুরু করেন। পরের ছয় বছর বেশ ভালোভাবেই বাবা-ছেলে মিলে কাজ করছিলেন। কিন্তু ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর যখন জাপানিদের দ্বারা আমেরিকান নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়, তখন কিটো পরিবারের ব্যবসা আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। বোমা বর্ষণের পর, আমেরিকান মিলিটারিরা জাপানি-আমেরিকানদের সন্দেহ শুরু করে। তারা ভাবে লিটল টোকিও আসলে গুপ্তচর হয়ে কাজ করছে এবং তারা আমেরিকার শত্রু। এর মধ্যে কিটো পরিবারকে সরাসরি টার্গেট করা হয়।
জাপানি-আমেরিকান ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ইতিহাসবিদ ও প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ক্যারেন ইশিজুকা বলেন, ‘অনেক জাপানি-আমেরিকান আর ২য় বিশ্বযুদ্ধের গল্প পার্ল হারবার দিয়ে শুরু হয়। এ ঘটনার পর সমাজ ইতিমধ্যেই জাপানবিরোধী হয়ে উঠছিল। এছাড়া জাপানি-আমেরিকানদের গুপ্তচর হিসেবে প্রচার করার প্রবণতাও তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’
১৯৪২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক লিন ডি রুজভেল্ট পশ্চিম উপকূলে জাপানি-আমেরিকানদের জোর করে আটকে রাখার অনুমোদন দেন। চার দিনের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার জাপানি আর জাপানি-আমেরিকান ওয়াশিংটন থেকে আরিজোনায় চলে যান। রাতারাতি আমেরিকাজুড়ে ১০টি ক্যাম্প বসানো হয়। দুই সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের জিনিসপত্রসহ জাপানিদের সেসব ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। লিটল টোকিও হয়ে ওঠে ভুতুড়ে এলাকা।
কিটো পরিবারকে তাদের দোকান বন্ধ করে দিতে হয়, যতটুকু সম্ভব জিনিসপত্র বিক্রি করে দিয়ে কিছু স্টোরেজে রেখে যায়। পরিবারটিকে প্রথমে পাঠানো হয় ক্যালিফোর্নিয়ার আর্কাডিয়ার সান্তা আনিতা পার্কে। সেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের ঘোড়ার স্তাবলে রাখা হয়েছিল। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে ট্রেনে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ইয়োমিং-এর হার্ট মাউন্টেন রিলোকেশন সেন্টারের ক্যাম্পে। পরের তিন বছর, কিটো পরিবারসহ আরও ১৪ হাজার বন্দি যে ব্যারাকে থেকেছে সেখানে মিলিটারি পুলিশরা পাহারা দিয়েছে। ছয় পরিবারের সদস্যদের জন্য কেবল একটি লাইট ও একটি স্টোভ ছিল রান্নার জন্য। ঘুমানোর জন্য ছিল আর্মিদের খাটিয়া আর প্রতিজনের জন্য কেবল দুটো কম্বল।
বন্দিরা যখন জানল সিচি মোচি কারিগর ছিলেন, সবাই তাকে তাদের চাল আর চিনি দিয়ে গেল যেন তিনি সবার জন্য মোচি আর মানজু কেক বানাতে পারেন। বন্দি জীবনে যেখানে ক্যাম্পে টিকে থাকাটাই অনেক কঠিন, সেখানেও সিচি মোচি বানালেন সেই পুরনো স্বাদে। বন্দিদের মধ্যে তার প্রশংসা ছড়াতে বেশি সময় লাগল না। হার্ট মাউন্টেনের এই বন্দি জীবনেই সিচির ছেলে রয়ের দেখা হয় কাজুকোর সঙ্গে। ভালোবেসে বিয়ে করেন দুজন।
ফিরে এসে নতুন সংগ্রাম
যুদ্ধের পর আমেরিকান সরকার চায়নি জাপানি-আমেরিকানরা তাদের বাড়িতে ফিরে আসুক। কিন্তু কিটো পরিবার যেভাবেই হোক ফিরতে চেয়েছিল লিটল টোকিওতে, যেটা আমেরিকায় ছিল তাদের একমাত্র বাড়ি। নতুন করে তারা আবার দোকানের কাজ শুরু করতে চেয়েছিল। যদিও সেটা মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। ফিরে এসে সিচি আর রয় যখন স্টোরেজ থেকে যন্ত্রপাতি বের করে কাজ শুরু করবেন ভাবছিলেন, তখন তাদের বলা হয় চার বছরের ভাড়া একসঙ্গে দিতে। এত টাকা একবারে জোগাড় করতে না পারায় বাড়ির মালিক তাদের সব যন্ত্রপাতি রেখে দেন। নিজেদের কোনো বাড়ি না থাকায়, কিটো পরিবার কয়াসান মন্দিরে প্রায় এক বছর বাস করে। রয় তখন ঘণ্টায় ০.২০ ডলারে ওয়েটারের কাজ শুরু করেন। এক বছর পর, ১৯৪৬ সালের মে মাসে, ফাজেতসু-ডু নতুন করে চালু হয়।
উত্তরাধিকার সূত্রে রয় তার বাবার ব্যবসার হাল ধরেন ১৯৫৭ সালে। যুদ্ধের এক দশক পর, যখনই জাপানি কোনো প্রতিবেশীর সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, কিটো পরিবার তাদের ভয় কাটানোর জন্য সবার আগে পুলিশের কাছে গেছে। আর কিটো পরিবার যেহেতু যুদ্ধের আগে থেকেই লিটল টোকিওতে বাস করে আসছে, সে কারণেও বেশিরভাগ মানুষই তাদের কাছে সাহায্যের জন্য ছুটে আসতো। এভাবেই সম্প্রদায়ে নেতৃত্ব শুরু হয় এই পরিবারের।
বাবার সঙ্গে দোকানে কাজ করতে করতে বড় হয়েছেন ব্রায়ান নিজেও। রয়ের মতো, তার নিজেরও মোচি তৈরিতে বেশ আগ্রহ আর দক্ষতা রয়েছে। ব্রায়ান পারিবারিক এই ব্যবসার দায়িত্ব পান ১৯৮০ সালে। জাপানি-আমেরিকান সম্প্রদায়ে তিনিও বেশ পরিচিত নাম। যে কোনো সাহায্য বিশেষ করে চিঠি পড়ার দরকার হলে, কারও পরামর্শ বা প্রতিবেশীদের কোনো বিষয়ে ফয়সালা করতে হলে সবাই ব্রায়ানের কাছেই আসেন।
১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে দাঙ্গা শুরু হলে শহরটিতে নতুন করে দুরবস্থা শুরু হয়। নিজের সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখার জন্য ব্রায়ান প্রতিষ্ঠা করেন লিটল টোকিও পাবলিক সেফটি অ্যাসোসিয়েশন। একদল স্বেছাসেবক তাদের এলাকাকে নিয়মিত টহল দেওয়া শুরু করে, রাস্তায় অর্থ পাচারকারী কাউকে আসতে দেওয়া হতো না, তারা পুলিশের সঙ্গে মিলে অপরাধ কমানোর কাজও করতেন। ব্রায়ান যদি সে সময় এমন সিদ্ধান্ত না নিতেন, তাহলে তাদের দোকানের আজ কী অবস্থা হতো সেটা তিনি ভাবতেও পারেন না।
প্রজন্মের রীতি
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফাজেতসু-ডু দেখতে যেমন ছিল, তেমনই আছে। ব্রায়ান ইচ্ছে করেই এর কোনো পরিবর্তন করেননি। কিটো পরিবারের একদম শুরু থেকে যে সব গ্রাহক ছিলেন তারা দোকানে এলেই পুরনো স্মৃতি খুঁজে পান বলে এর চেহারা আগের মতোই রেখেছেন তিনি।
ফাজেতসু-ডু এর একজন গ্রাহকের নাম জোয়ানি তাশিরো। তিনি বলেন, ‘এই দোকানটি আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। এটা আমাদের বাড়ির মতো। ছোটবেলায় দাদির সঙ্গে আমি এখানে অনেক এসেছি। দাদি মারা যাওয়ার পর আমার বিয়ে ঠিক হলে আমি কিটো পরিবারকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে যেন দোকানে কিছু ছবি তুলতে দেওয়া হয়। এটি আমার দাদির স্মৃতি হিসেবে আমার কাছে থাকবে। এভাবেই দাদি আমার বিয়ের অংশ হয়ে ছিলেন।’ এখন তাশিরো ৩৪০ মাইল উত্তরে সান জোসে থাকেন। কিন্তু যখনই লিটল টোকিওতে আসেন, একবার হলেও দোকানে এসে নিজের জন্য মানজু কেক আর পরিবারের সবার জন্য বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি নিয়ে যান।
ফাজেতসু-ডু এর মোচি আর মানজুর স্বাদ এখনো আগের মতোই। সিচি যে রেসিপিতে এগুলো বানাতেন সেই রেসিপি আজও মেনে চলা হয়। প্রতিদিন আঠালো চালগুলোকে মিষ্টির স্বাদে ভরিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে চালগুলোকে সেদ্ধ করে সেগুলো দিয়ে মসৃণ বলের আকৃতি করে সেটি ঢেকে দেওয়া হয় আলুর গুঁড়ো দিয়ে। এরপর সেটিকে হয়তো সেভাবেই রেখে দেওয়া হয় নইলে রেড বিনের পেস্ট বানিয়ে তার পুর ভেতরে দেওয়া হয়। কিটো পরিবার চালের গুঁড়ো দিয়েও মোচির মতো দেখতে ছোট আকারের ‘ডাঙ্গো’ নামের আরেকটি মিষ্টি বানায়। এখন অনেকেই মোচি বানানোর কাজ করেন। তবে তাদের মধ্যে কিটো পরিবারের মতো এত আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করার প্রবণতা তেমন নেই। যার কারণে ফাজেতসু-ডু’র হাতে বানানো নরম আর সুস্বাদু মোচির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। রান্নাঘর থেকে গরম গরম মোচি যখন বের হয়ে আসে সেটি গ্রাহকদের জিভে পানি আনতে বাধ্য। ফাজেতসু-ডু তে রোজ এক হাজারেরও বেশি মোচিসহ অন্যান্য খাবার বিক্রি করা হয়। ব্রায়ান মোচি বানাচ্ছেন ৪৪ বছর ধরে। দোকানের সামনের দিক সামলান স্ত্রী তোমোকো। ব্রায়ানের সঙ্গে এখন কাজ করছে তার ১৯ বছরের ছেলে কোরে।
ব্রায়ান দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে বড় পরিবর্তনগুলো শুরু করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল আমেরিকান ও এশিয়ান সুপার মার্কেটগুলোতে তার খাবারের জন্য পাইকারি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ২০০০ সালে মোচি যখন দইয়ের ওপর টপিং হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন থেকে নন-জাপানিদের কাছেও মোচি পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্রায়ান এরপর আমেরিকান ফ্লেভার যেমন চকলেট, পিনাট বাটার, ফলের স্বাদে মোচি নিয়ে আসেন। এছাড়াও আনেন রঙিন ড্যাংগো মোচি। ঐতিহ্যবাহী স্বাদ তো ছিলই, সঙ্গে কারিগরের নিজের তৈরি স্বাদ যুক্ত করে দেওয়ায় মোচি-মানজুর চাহিদাই বদলে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চকলেট মানজুতে ফ্রেশ স্ট্রবেরির ব্যবহার অথবা স্ট্রবেরি স্বাদের মানজুর ওপর এক টুকরো চকলেট। এগুলো অবশ্য বিক্রি করা হতো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া গ্রাহকদের জন্য।
গত শতাব্দী জুড়ে এই দোকানটিকে অনেক কঠিন অবস্থা পার করতে হয়েছে। বেঁচে থাকার রাস্তা খুঁজে বের করতে হয়েছে। বর্তমানে তাদের নতুন চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা। কারণ অনেক পরিবর্তন হয়েছে এখন এই এলাকায়। ব্রায়ান বলেন, ‘এটা আমার সেই ছোটবেলার লিটল টোকিও আর নেই। শুধু আমার দোকানটাই যা আগের মতো রয়ে গেছে।’ লিটল টোকিওর প্রথম আর দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক জাপানি-আমেরিকান অন্য জায়গায় চলে গেছেন, তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে কারণ তাদের উত্তরাধিকারীরা পারিবারিক ব্যবসা ধরে রাখতে চাননি। এত পরিবর্তনের পরেও তারা একে অপরকে চেষ্টা করছেন স্থানীয় ব্যবসাগুলো টিকিয়ে রাখার। সম্প্রতি সেই বন্দি জীবন কাটানোর প্রায় ৮০ বছর পর, ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাসেম্বলি এই ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি এবং জাপানি-আমেরিকানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। ব্রায়ান বলেন, ‘যদি এই ক্ষমা প্রার্থনাটা স্কুলের ইতিহাসের বইয়ের ভেতরেও জায়গা দেওয়া যেত, তবে ভবিষ্যতের অনাকাক্সিক্ষত অনেক বিষয়কেই এড়ানো যেত।’
টিকে থাকার সম্ভাবনা
ব্রায়ান এখন শুধু স্বপ্ন দেখেন তার ছেলে কোরে একদিন তাদের এই পারিবারিক ব্যবসাকে আরও অনেকদূর নিয়ে যাবে। এই সম্প্রদায়কে ঠিক সেভাবেই সেবা দেবে যেভাবে তার আগের তিন প্রজন্ম দিয়ে এসেছে। কোরে চাইলে পড়াশোনা শেষে এখানে যুক্ত হতে পারে, তবে সম্পূর্ণটাই তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কোরে অবশ্য চায়, জাপান থেকে মোচির ওপর মাস্টার্স করে এসে ভবিষ্যতে এই দোকানকে আরও বহুদূর নিয়ে যেতে।
কোরে যখন ব্যবসা করবে তখন সেটি যেন শুধু টাকার জন্য না হয় সেটিই চান ব্রায়ান। বর্তমানের এই মহামারীকে সামাল দিতে যেখানে লস অ্যাঞ্জেলেসের অনেক দোকান বন্ধ ছিল, সেখানে ব্রায়ান আর কোরে নিয়মিত রান্নাঘরে কাজ করেছেন যেন সুপার মার্কেটগুলোতে সময়মতো খাবার পৌঁছানো যায়। লিটল টোকিওতে খাবারের যেন কমতি না হয় সেজন্যও তাদের প্রয়াস ছিল। কেউ জানে না ভবিষ্যতে কী হবে, তবে ব্রায়ান আশা করেন, ফাজেতসু-ডু বর্তমানের সাংস্কৃতিক আর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে পাড়ি দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে আরও অনেকদিন টিকে থাকবে।