ইউজিসির প্রতিবেদন ‘একপেশে’ দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আবদুস সোবহান তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি সংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রতিবেদনকে ‘একপেশে ও পক্ষপাতমূলক’ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন সিনেট ভবনে এক সংবাদ সম্মেলন উপাচার্য এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রশাসনের (সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মিজান উদ্দীন ও তার নেতৃত্বাধীন) বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে।’

ইউজিসির তদন্ত কমিটি রাবি উপাচার্য অধ্যাপক সোবহান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এমএ বারীর বিরুদ্ধে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি, টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে। গত মঙ্গল ও বুধবার কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তসংক্রান্ত ৩৬ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন এবং আরও প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার সংযোজনী প্রতিবেদন জমা দেয়।

ইউজিসির প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল উপাচার্য সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘ইউজিসি গঠিত তদন্ত কমিটি যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তা সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সূত্র দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদগুলো জনমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য সবার কাছে আমার অবস্থান স্পষ্ট করছি।’

অধ্যাপক সোবহান বলেন, ‘যেকোনো আমলযোগ্য অভিযোগের তদন্ত বাঞ্ছনীয়, আমিও তদন্তের পক্ষে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো যথাযথ হলে তদন্তে আমার শতভাগ সম্মতি রয়েছে। তবে সেই তদন্ত হতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে আইনসিদ্ধভাবে গঠিত পক্ষপাতহীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে। আর এটিই আমি গত ৯ সেপ্টেম্বর ইউজিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। আমি আশা করেছিলাম, চিঠিটি বিবেচনায় নিয়ে চেয়ারম্যান পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তা একপেশে ও পক্ষপাতমূলক। এজন্য আমার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে। দায়িত্ব নিয়ে আমি ঢাকাস্থ অতিথি ভবন কেনায় ১৩ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে হেকেপ প্রকল্পের সাড়ে ৩ কোটি টাকা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণে ৮০ লাখ টাকা তছরুপ খতিয়ে দেখার জন্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি করি। এরপর থেকে এসব অপকর্মে জড়িতরা বিভিন্ন দপ্তরে আমার বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ দিয়েছে।’

শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা : শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘১৯৮৫ ও ১৯৯২ সালে প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী ২০১২ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত নিয়োগ কার্যক্রম চালু ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হওয়ার পর সনাতন পদ্ধতির সঙ্গে গ্রেডিং পদ্ধতির জিপিএ সংযোজন করে ২০১২ সালের ১০ মে সিন্ডিকেট সভায় নতুন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুমোদিত হয়। সাবেক উপাচার্য মিজান উদ্দীন এ নীতিমালাতেই শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। পরে তিনি ২০১৪ সালে তার কন্যার এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএকে ভিত্তি ধরে শুধু ইংরেজি বিভাগের নিয়োগে যোগ্যতা পুনর্নির্ধারণ করেন। কন্যাকে নিয়োগের ১০ দিনের মাথায় ২০১৫ সালে সিন্ডিকেট সভায় সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের জন্য অতি উচ্চ যোগ্যতা রেখে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফের নিয়োগ নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়। এ নীতিমালায় বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন বিভাগ ও শিক্ষক সমিতি নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের জন্য লিখিত অনুরোধ করে। তাদের অনুরোধেই শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পুনরায় নির্ধারণের জন্য ২০১৭ সালে সাত সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে করা নীতিমালা ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর সিন্ডিকেট অনুমোদন দেয়। তবে এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরে আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রায় দিয়ে নীতিমালাটি যথাযথ অনুসরণের নির্দেশনা দেয়।’

মেয়ে-জামাই নিয়োগ : নিজের মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করা হয়নি বা কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে অধ্যাপক সোবহান বলেন, ‘২০১৭ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ২৪টি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিভাগের নিয়োগ শেষ হলেও তা নিয়ে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ আসেনি। অথচ এখন এটিকে আমার জামাই-মেয়েকে নিয়োগের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

ইউজিসির শুনানিতে না যাওয়ার ব্যাখ্যা : গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইউজিসির অডিটরিয়ামে শুনানির আহ্বান করে তদন্ত কমিটি। ওই শুনানিতে অভিযোগকারীরা গেলেও উপাচার্য কিংবা প্রশাসনের কেউ যাননি। এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘রীতি অনুযায়ী তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তদন্ত করবে। জাহাঙ্গীরনগর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটিই হয়েছে। কিন্তু রাবির ক্ষেত্রে কমিটি করোনা পরিস্থিতির কারণে আসতে অপারগতা জানায়। বাস্তবে পরিস্থিতি এমনই হলে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত উপাচার্যসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কীভাবে ঢাকায় যাবে? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কি এতটাই গুরুত্বহীন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?’

বাড়ি দখল : ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে উপাচার্যের বিরুদ্ধে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি দখলে রাখার কথা উল্লেখ করা হয়। বিষয়টিকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর দাবি করে অধ্যাপক সোবহান বলেন, ‘দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার পর আমি সাধারণ অধ্যাপক হিসেবে আগের বরাদ্দকৃত বাড়িতেই বসবাস করছিলাম। দায়িত্ব গ্রহণ করলেও উপাচার্যের বাসভবনে উঠিনি। তবে উপাচার্যের বাসভবনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ছেড়ে দিয়েছি। অথচ ষড়যন্ত্রকারীরা মিথ্যা অভিযোগ করেছে, আমি দুটিই রেখেছি। তাদের মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত তথ্যই ইউজিসি তুলে ধরেছে, যা পক্ষপাতের অন্যতম দৃষ্টান্ত।’

সম্পদের উৎস সন্ধান : ইউজিসির তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে উপাচার্য ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সম্পত্তি এবং আয়ের উৎস খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনে যে সুনাম অর্জন করেছি, সেগুলোই আমার সম্পদ। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আমার ও আমার নিকটজনদের সম্পদ খতিয়ে দেখা হোক। অবৈধ কোনো সম্পদ পেলে আমি দায়িত্ব থেকে সরে যাব।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি। নথিপত্র চেয়ে চিঠি দিলে সেগুলো বস্তা আকারে পাঠিয়ে দিয়েছি। দ্বিতীয় দফায় নথিপত্র চাইলে তাও দিয়েছি। কিন্তু তৃতীয় দফা চিঠি দিয়ে একই বিষয়ের নথি চেয়েছে। বারবার একই নথি চাওয়া আমার কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে।’

অধ্যাপক সোবহানের অভিযোগ, উপাচার্য পদের লোভে কতিপয় বিপথগামী শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছে। সবমিলে তারা সাত-আটজন। আমার পরে এদের কেউ উপাচার্য নিয়োগ পেলে বাকিরা তার বিরুদ্ধেও একই কাজ করবে। এটি অশুভ প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মর্যাদা রক্ষায় এ অশুভ প্রতিযোগিতা থামানো উচিত।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এমএ বারী, প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।