মুক্তি পায়নি সরকারি অনুদানের অর্ধেকের বেশি চলচ্চিত্র

সরকারি অনুদান নিয়ে সিনেমা না বানানোর ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কবি টোকন ঠাকুরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আলোচনা তৈরি করেছে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে। এদিকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অনুদান নিয়ে অর্ধেকের বেশি সিনেমা এখনো মুক্তি পায়নি। ২০০৭ থেকে ’১৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪১টি চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুক্তি পেয়েছে মাত্র ১৫টি।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিনেমা নির্মাণ করতে না পারার জন্য গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয়, তবে সিনেমা নির্মাণ করতে না পারার জন্য অবশ্যই জবাবদিহিতা কঠোর হওয়া উচিত।

২০১২-১৩ অর্থবছরে ‘কাঁটা’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য অনুদান পেয়েছিলেন টোকন ঠাকুর। সেই সিনেমার কাজ সাত বছরেও শেষ করতে পারেননি তিনি। সরকারি টাকা তছরুপের অভিযোগে গত ৩ অক্টোবর তথ্য মন্ত্রণালয়ের মামলায় টোকন ঠাকুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় এবং রবিবার গ্রেপ্তার হন তিনি। গতকাল সোমবার জামিন পেয়েছেন টোকন।

সরকারের চলচ্চিত্র অনুদান নীতিমালা অনুযায়ী, অনুদান পাওয়ার ৯ মাসের মধ্যে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো কোনো সিনেমা সাত-আট বছরেও নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেননি নির্মাতারা।

চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদান নিয়ে ঠিক সময়ে সিনেমার নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারার জন্য অবশ্যই নির্মাতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তবে এর জন্য নির্মাতাকে গ্রেপ্তার করার ঘটনাকে সমর্থন করি না।’

অনুদানের টাকার পরিমাণ কম থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘টোকন ঠাকুর যখন অনুদান পেয়েছে, তখন টাকার পরিমাণ খুবই কম ছিল। ৩৫ লাখ টাকা ছিল। সেই টাকা দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার নির্মাণকাজ শেষ করা আসলেই কঠিন। পরে টোকনকে নানারকম স্ট্রাগল করতে হয়েছে। এখন অনুদানের টাকা বাড়িয়ে ৭৫ লাখ করা হয়েছে। এখন মনে করি অনুদানের টাকা দিয়ে সিনেমা নির্মাণ সম্ভব। ফলে মন্ত্রণালয়ের উচিত, অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি সিনেমা নির্মাণের বিষয়টিও জবাবদিহিতার আওতায় আনা, এর জন্য কঠোর হওয়া। কিন্তু গ্রেপ্তার করার বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয়। টোকন ঠাকুর তো পালিয়ে যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সমর্থন করি না। যতদূর জানি, সে সিনেমাটির নির্মাণকাজ শেষও করে ফেলেছে।’

২০১২-১৩ অর্থবছরে কাঁটা সিনেমার সঙ্গে অনুদান পাওয়া অন্যগুলোর মধ্যে একাত্তরের মা জননী, একাত্তরের ক্ষুদিরাম, মেঘমল্লার ও খাঁচা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর ‘কাগজের ফুল’ সিনেমাটির নির্মাণ আটকে যায়। পরে এর প্রযোজক ক্যাথরিন মাসুদ অনুদানের অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত দিতে চাইলে মন্ত্রণালয় থেকে তাকে সিনেমাটি শেষ করার জন্য বলা হয়। এছাড়া নার্গিস আক্তারের পরিচালনায় যৈবতী কন্যার মন সিনেমার কাজ শেষ হলেও মুক্তি পায়নি।

১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদানের প্রথা চালু করে। মাঝখানে বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার জন্য ৭৫ লাখ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার জন্য ২০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে।

১৯৭৬ সালে অনুদান পাওয়া বেবী ইসলামের মেহেরজান এখনো মুক্তি পায়নি। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এনামুল করিম নির্ঝর পরিচালিত ‘নমুনা’ সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জুনায়েদ হালিম পরিচালিত ‘স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের গল্প’ সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। ২০১০-১১ অর্থবছরে মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেনের ধোঁকা, ফারুক হোসেনের কাকতাড়ুয়া মুক্তি পায়নি।

২০১১-১২ অর্থবছরে নেকড়ে অরণ্য সিনেমার জন্য প্রথম কিস্তির টাকা গ্রহণ করার পরও এর কাজ শুরু করতে না পারায় মারুফ হাসান আরমানের বিরুদ্ধে মামলা করে তথ্য মন্ত্রণালয়। শিশুতোষ সিনেমা ‘একা একা’র জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছিলেন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। কিন্তু নির্মাণ না করায় গুণী এ নির্মাতার বিরুদ্ধেও অর্থ আদায়ের জন্য মামলা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে পাঁচ বছরেও মুক্তি পায়নি প্রশান্ত অধিকারী পরিচালিত ‘হাডসনের বন্দুক’।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে অনুদান পাওয়া সিনেমার মধ্যে ড্যানি সিডাক পরিচালিত ‘কাঁসার থালায় রুপালি চাঁদ’ মুক্তি পায়নি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নূরুল আলম আতিক পরিচালিত ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’, এন রাশেদ চৌধুরী পরিচালিত ‘চন্দ্রাবতী কথা’, মাহমুদ দিদার পরিচালিত ‘বিউটি সার্কাস’ মুক্তি পায়নি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসডি রুবেল পরিচালিত ‘বৃদ্ধাশ্রম’, কামার আহমাদ সাইমনের ‘শঙ্খধ্বনি (শিকলবাহা)’ মুক্তি পায়নি।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ‘নোনাজলের কাব্য’, ‘রূপসা নদীর বাঁকে’, ‘আজব সুন্দর, ‘প্রিয় জন্মভূমি’ ‘দায়মুক্তি’ মুক্তি পায়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ‘কালবেলা’, ‘আজব ছেলে’ ও ‘অবলম্বন’ মুক্তি পায়নি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কবরীর ‘এই তুমি সেই তুমি’, হোসেন মোবারক রুমীর ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’, হৃদি হকের ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ সিনেমার শুটিং চলছে। মীর সাব্বির পরিচালিত ‘রাতজাগা ফুল’, শমী কায়সার পরিচালিত ‘স্বপ্ন মৃত্যু ভালোবাসা’ ও আকরাম খান পরিচালিত ‘নকশি কাঁথার জমিন’ সিনেমার শুটিং শুরু হবে বলে জানা গেছে।

অনুদান পাওয়ার পর সিনেমার নির্মাণকাজ শেষ না করতে পারার কারণ জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিভাগের শিক্ষক চলচ্চিত্র নির্মাতা জুনায়েদ হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে অনুদানের জন্য যে টাকা দেওয়া হয়েছে সেটা দিয়ে সিনেমা বানানো সম্ভব না। ১৫ লাখ টাকা মন্ত্রণালয় দিয়েছে, আর এফডিসি থেকে ১০ লাখ টাকার কারিগরি সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু আমার সিনেমাটা বানাতে লাগবে সোয়া দুই কোটি টাকা। অনেক জায়গায় টাকার জন্য ঘুরেছি, কয়েকটা গান রেকর্ডও করেছি। কিন্তু টাকার জন্য ছবিটা করতে পারিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি, টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেন অথবা এই টাকা ফেরত নেন। তারা আমাকে চিঠি ধরিয়ে দিয়েছে, আদালতে মীমাংসা করতে বলেছে। আমি আদালতে যাব কেন? আমি তো চোর না। মন্ত্রণালয় চাইলে আমি কালই টাকা ফেরত দেব। তবে এত দিনে টাকার যে সুদ হয়েছে সেটা দিতে পারব না। এ ছাড়া এই ছবির প্রস্তুতিতে আমার অনেক লোকসান হয়েছে।’

জামিন পেলেন নির্মাতা ও কবি টোকন ঠাকুর : সরকারি অনুদানে নির্মাণাধীন ‘কাঁটা’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ও কবি টোকন ঠাকুর জামিন পেয়েছেন। এর আগে সরকারি পাওনা আদায়ে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলায় গত রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকার কাঁটাবন এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গতকাল সোমবার ঢাকার মহানগর হাকিম আবু নোমান মো. সুফিয়ান শুনানি শেষে টোকন ঠাকুরের জামিন শর্ত সাপেক্ষে মঞ্জুর করেন। শর্ত হলো, মঙ্গলবার নির্বাহী হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে টোকন ঠাকুরকে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি এ আদালতেই বিচারাধীন। আদালতে টোকন ঠাকুরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস ও পারভেজ হাসেম।

কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের ছোটগল্প ‘কাঁটা’ অবলম্বনে একই শিরোনামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পেয়েছিলেন টোকন ঠাকুর। অনুদানের অর্থ গ্রহণের ৯ মাসের মধ্যে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সাত বছরেও তা সম্পন্ন করতে পারেননি তিনি।

সিনেমা নির্মাণ শেষ করতে কিংবা অর্থ ফেরত চেয়ে একাধিকবার তাকে চিঠি পাঠিয়েও কোনো উত্তর না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মামলা করেছিল তথ্য মন্ত্রণালয়। ওই মামলাতেই গত ৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

এদিকে করোনা মহামারী শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে টোকন ঠাকুর গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘কাঁটা’র শুটিং পর্ব ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। ডাবিং, আবহসংগীত আর সম্পাদনার কাজ বাকি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার শুটিংয়ের আয়োজনের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন সেটা অনুদানের টাকায় সম্ভব হয়নি। শিল্পীদের অনেকেই ভালোবেসে সিনেমায় কাজ করেছেন। অনুদানের টাকা শেষ হওয়ার পর বাইরের অনেকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে সিনেমার শুটিং করেছি। বাকি অর্থের জন্য অনেক জায়গায় বলেছি, প্রোপোজালও জমা দিয়েছি। এখন সিনেমার কিছু কাজ শেষ হলেই মুক্তি দিতে পারব।’