অবশেষে চালু হচ্ছে কুয়েত এয়ারলাইনসের ফ্লাইট। বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশে সরাসরি তাদের ফ্লাইট চালু হবে। তবে কুয়েতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট কবে চালু হবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে দুই দেশের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। তারপরও বাংলাদেশের শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে বেবিচক কুয়েত এয়ারলাইনসকে ফ্লাইট চলার অনুমতি দিয়েছে। কুয়েতের ফ্লাইট চালু হলেও কঠিন শর্তের মুখে পড়তে যাচ্ছেন যাত্রীরা। কুয়েতে যাওয়ার আগে ও পরে পরপর তিনবার করে করোনার পরীক্ষা করাতে হবে প্রত্যেক যাত্রীকে। প্রথমে নিজ দেশ থেকে আসার সময় পিসিআর সনদ নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়বার কুয়েত এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর এবং তৃতীয়বার সাত দিন বাসায় অথবা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টানে থাকার পর করোনা টেস্ট করাতে হবে। একই শর্ত প্রযোজ্য হবে স্বল্প ঝুঁকির দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি কুয়েতের মিসিলায় বাংলাদেশ দূতাবাসে মিরসরাই সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়কালে নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান জানিয়েছেন, কুয়েত সরকারের সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি। বাংলাদেশে অনেকে আটকা আছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তার মধ্যে অনেকের ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে আসছে। কুয়েত সরকারও আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশের ফ্লাইট চালু হবে। বাংলাদেশ থেকে যাতেও বিমানের ফ্লাইট কুয়েত আসতে পারে সেজন্য আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশে^র প্রতিটি দেশের সঙ্গেই বিমানের ফ্লাইট চলাচলের চেষ্টা চলছে। শিগগির কুয়েত এয়ারলাইনসের ফ্লাইট শুরু হবে বলে আশা করছি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও যাতে কুয়েতে ফ্লাইট চলাচল শুরু করতে পারে সেজন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। ২৮ অক্টোবর থেকে ভারতে ফ্লাইট চলাচল শুরু হচ্ছে। ধীরে ধীরে সব দেশেই বিমান চলাচল স্বাভাবিক হবে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, চলতি বছর ১২ জুলাই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিদেশগমনেচ্ছু যাত্রীদের কভিড-১৯ মুক্ত সনদ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সপ্তাহখানেক পর ১৯ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানায়, ২৩ জুলাই থেকে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে বিদেশগমনকারী সব এয়ারলাইনসের যাত্রীদের কভিড পরীক্ষার সনদ বাধ্যতামূলক। কভিড-১৯ পরীক্ষার বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়। বিদেশগামী যাত্রীকে বিমানযাত্রার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নমুনা জমা দিতে হবে। করোনা পরীক্ষার সরকার নির্ধারিত ফি ২০০ টাকা। কিন্তু বিদেশগামী যাত্রীদের সশরীরে ল্যাব গিয়ে পরীক্ষার জন্য দিতে হবে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করলে ফি দিতে হবে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ১৪টি জেলায় বিদেশগামীদের করোনা পরীক্ষার স্যাম্পল নেওয়া হবে। এসব স্যাম্পল পরীক্ষা করা হবে ১৬টি হাসপাতালে। যেসব জেলায় স্যাম্পল সংগ্রহের বুথ রয়েছে সেগুলো হচ্ছেÑ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লায়। কিন্তু ওইসব স্থানে পরীক্ষা করাতে গিয়ে অনেকে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ছেন। বিশেষ করে সৌদি আরবে যেতে গিয়ে অনেকে ঝামেলায় পড়েছেন বেশি।
এ প্রসঙ্গে বেবিচকের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, করোনার পরীক্ষা আরও সহজ করতে আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। এখন বিশ্বের যেকোনো দেশেই যেতে হলে করোনার পরীক্ষা করাতে হবে। কুয়েত যেতে হলেও একই নিয়ম পালন করতে বলা হয়েছে। আগামীকাল বুধবার থেকে ভারতে ফ্লাইট চালু হচ্ছে। এ দেশেও যেতে হলে ভ্রমণের ৭২ ঘণ্টা আগে কভিড পরীক্ষা করাতে হবে। তিনি আরও বলেন, করোনার পরীক্ষা করাতে গিয়ে সৌদি আরবের যাত্রীরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন তা সত্য। দেশের প্রতিটি জেলায় বিদেশগামী লোকজন যাতে করোনার পরীক্ষা করাতে পারে সেজন্য আলোচনা চলছে। আপাতত নিদিষ্ট ল্যাবে পরীক্ষা করাতে বলা হয়েছে সবাইকে।
ঢাকায় কুয়েত এয়ারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একযোগে এসব দেশে ফ্লাইট চালু করা হলেও বেশ কিছু শর্তের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে করোনার প্রভাব অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা কম থাকায় কুয়েত এয়ারের যাত্রীরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেতেও পারেন। করোনার হটস্পটে থাকা ভারতের যাত্রীদের বেলায় ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে তা শিথিল করা হতে পারে। এছাড়া ফ্লাইটের স্বাস্থ্যবিধি সবার জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনার তা-ব কিছুটা কম মনে হলেও শীতে তা কতটা ভয়ংকর আকার ধারণ করে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এই মুহূর্তে কুয়েত ও বাংলাদেশে কতসংখ্যক বাংলাদেশি অবস্থান করছেন এবং দেশে কতজন ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন সেটার ওপর নির্ভর করছে বিমানসহ কুয়েত এয়ারের বাণিজ্যিক সফলতা। দুনিয়াব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে বন্ধ রয়েছে কুয়েতের সঙ্গে বাংলাদেশের ফ্লাইট যোগাযোগ। সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত। এ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, মিসর, ফিলিপাইন, লেবানন, শ্রীলঙ্কাসহ ৩৪টি দেশ।
জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে শ্রমবাজার নিয়ে কথা বলেন। ড. মোমেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে দুদিনের ওই সফরে শিগগিরই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য কুয়েতের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আবার চালুর বিষয়ে অনুরোধ জানান। তাতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আহমাদ নাসের আল-মোহাম্মেদ আল-আহমেদ আল-জাবের আল-সাবাহ।
এদিকে করোনার দাপট কমে এলেও আগের মতো কুয়েত ফ্লাইট বাণিজ্যিক সফলতা পাবে কি না সেটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কুয়েত সরকার তার দেশ থেকে অভিবাসীদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে একটি প্রবাসী কোটা বিল প্রণয়ন করেছে। ওই খসড়া আইনে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য মাত্র ৩% কোটা প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দেশটিতে অবস্থানরত আড়াই লাখের বেশি অভিবাসীকে ফেরত আসতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী কুয়েতে মোট জনসংখ্যা ৪৩ লাখ, তার মধ্যে ৩০ লাখ অভিবাসী। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৭০%। কুয়েতের মোট জনসংখ্যার ৭০% অভিবাসী হওয়ায় দেশটির সরকার সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছে অভিবাসীর সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ৩০% শতাংশে নামিয়ে আনতে। যেন জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। এ লক্ষ্যে ওই দেশের পার্লামেন্টের একটি কমিটি সম্প্রতি এ সংক্রান্ত খসড়া কোটা বিল অনুমোদন করে। এতে আড়াই লাখেরও বেশি বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা দেখা গিয়েছে।