‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২’ অনুযায়ী পর্নোগ্রাফিতে শিশুদের সম্পৃক্ত করার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান থাকার পরও এ ধরনের অপরাধ রোধ করা যাচ্ছে না। বরং শিশুসহ নারীদের বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সঙ্গে আছে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ধর্ষণ ও নানা ধরনের হয়রানির ঘটনা। এসব ঘটনার মধ্যে গোপনে শিশুদের পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহারের যে খবর মিলেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
দেশ রূপান্তরে গত সোমবার প্রকাশিত ‘চার হাজার জনের পরিচয় খুঁজছে’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই কিশোরীর অভিযোগ তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার বিভিন্ন আলামত পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পর্নোগ্রাফি চক্রের ৪৫টি গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এসব গ্রুপের প্রতিটির সদস্য ৮৫০-৯০০ জন। গ্রুপগুলোর রেজিস্টার্ড মেম্বার হিসেবে প্রায় চার হাজার বাংলাদেশির তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, এ চক্রের অনেক সদস্য ইন্সটাগ্রামভিত্তিক বিভিন্ন চাইল্ড পর্নোগ্রাফি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। ইন্সটাগ্রামে চাইল্ড পর্নো গ্রুপগুলো ‘শাটআউট’ নামে পরিচিত। এসব গ্রুপ থেকেই শিশু-কিশোরীদের মোটিভেটেড করে নগ্ন ছবি সংগ্রহ করে থাকে তারা। তারা মূলত ইন্সটাগ্রামে ফেক আইডি বানিয়ে নিজেকে সমকামী নারী হিসেবে উপস্থাপন করে। পরে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে নগ্ন ভিডিও এবং ছবি সংগ্রহ করে তা পর্নো সাইটে আপলোড করে। এরকম অপরাধী চক্রের সন্ধান আগেও বিভিন্ন সময় পাওয়া গিয়েছে। ২০১৪ সালে শিশুদের নিয়ে সরাসরি পর্নোগ্রাফি তৈরি করার অভিযোগে টিপু কিবরিয়া নামে এক তথাকথিত শিশুসাহিত্যিক ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা খিলগাঁওয়ের একটি স্টুডিওতে শিশুদের নিয়ে গিয়ে পর্নোগ্রাফি তৈরি করত।
দেশের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুকে ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, বিতরণ, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অথবা শিশু পর্নোগ্রাফি বিক্রি, সরবরাহ বা প্রদর্শন অথবা কোনো শিশু পর্নোগ্রাফি বিজ্ঞাপন প্রচার করলে তার সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হবে। কিন্তু আইন থাকার পরও কেন শিশুদের পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহার কিংবা সাইবার ক্রাইমের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না? সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস (সিসিএ) ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে ভার্চুয়াল জগতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১১ ধাপে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এগুলো হলো- ৬.৫১ শতাংশ ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি, আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের হুমকি, কপিরাইট আইন লঙ্ঘন, পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে প্রতারণা, অনলাইনে কাজ করিয়ে নেওয়ার কথা বলে প্রতারণা ইত্যাদি। আক্রান্তদের মধ্যে নারী ভুক্তভোগী আগের চেয়ে বেড়েছে ১৬.৭৭ শতাংশ। আর ভুক্তভোগীদের ৮০.৬ শতাংশই সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করতে যান না। দেশে সাইবার ক্রাইমের সবচেয়ে বড় শিকার যে নারীরা, তা এ গবেষণা দ্বারা প্রতীয়মান হয়। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঘটিয়ে নারীদের ওপর এ সহিংসতার রাশ যদি এখনই টেনে না ধরা যায়, তাহলে এর পরিণাম যে ভয়াবহ হবে, তা সহজেই বোধগম্য।
‘চাইল্ড পর্নোগ্রাফি’-এর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এর অশুভ তৎপরতা রোধ করা যাচ্ছে না। শিশুদের নিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবির ওয়েবসাইট রয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি। ১০ লাখের বেশি শিশুর ছবি রয়েছে এসব সাইটে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ইন্টারপোল ১০ হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে বিভিন্ন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শিশুদের পর্নোগ্রাফি কিংবা যৌন হিংসা রোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ। এমন কিছু শব্দ বা কি-ওয়ার্ড রয়েছে, যেসব কি-ওয়ার্ড অর্থাৎ শব্দ লিখে শিশু পর্ন ও যৌন হিংসার ছবি বা ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। সেই সমস্ত শব্দকে ব্লক করার জন্য বেশ কিছু শব্দের তালিকাও তৈরি করে শব্দগুলো ব্লক করতে শুরু করেছে গুগল, ফেইসবুক-সহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো। পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশে যৌনতা-সংশ্লিষ্ট শব্দ কেউ খোঁজ করলে তার বয়স ও অবস্থান সম্পর্কে স্বয়ংক্রিয় নোটিফিকেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা করা যায় কি-না, তা বিবেচনা করা জরুরি। এছাড়া যারা শিশুদের পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহারের অপতৎপরতা চালাবে তাদের প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে আপত্তিকর চিত্র ধারণ করে প্রতারণা বা হুমকির ব্যাপারেও কঠোরতা কাম্য। সর্বোপরি, শিশু এবং নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা রোধে সচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই।