দেখতে দেখতে ১০০ বছর বয়স হয়ে গেল উপমহাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির। বলা হচ্ছে বটে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ। বাস্তবে তো তখন আর দেশ তিন টুকরো ছিল না। ফলে ভালো খারাপ যাই হোক পার্টি লিগাসির দায় বা কৃতিত্ব শুধু ভারতের নয়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেরও। অন্তত ১৯৪৭ সালের আগে অবধি অখন্ড ভারতের নানা পর্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল তাতে অবিভক্ত বাংলার পাশাপাশি অবদান ছিল পেশোয়ার, লাহোর, অমৃতসর, করাচি ও অন্যান্য শহরেরও। ১৯২০ সালে মস্কোতে ভারতীয় বিপ্লবীরা যে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার অন্যতম সংগঠক ছিলেন এক বঙ্গসন্তান মানবেন্দ্র নাথ রায়। যদিও সেই প্রবাসী পার্টির সম্পাদক হয়েছিলেন পেশোয়ারের এক সাধারণ ক্লার্ক। সাধারণ অথচ অসাধারণ পেশোয়ারের নৌশহরা তহশিলের সেচ দপ্তরের ওই ক্লার্ক মুহাম্মদ শফিক ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সচিব।
সত্যি কথা বলতে কি, উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পেছনে মুসলমান সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদ তার বিখ্যাত আত্মজৈবনিক বই ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ উৎসর্গ করেছেন লাহোরের মীর আব্দুল মজিদ ও ফিরোজুদ্দীন মনসুরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। ভাবলে অবাক হই কী কঠিন জীবন প্রথম দিকের কমিউনিস্ট কর্মীরা বেছে নিয়েছিলেন সাম্যবাদী স্বপ্ন এদেশের জনমনে চারিয়ে দিতে। খেলাফত আন্দোলনের পরে এদেশে প্রভাবশালী মুসলিমদের বড় অংশ কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি এক সময়ের ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ অনেকেও বেছে নিয়েছিলেন কমিউনিস্ট জীবন।
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন আজ শতধা বিভক্ত। এখানে কমিউনিস্ট আন্দোলন মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। সিপিএমের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় পথের অনুগামীদের পাশাপাশি মাওবাদী কমিউনিস্টদের সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাও কিন্তু এদেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়।
কেরালা সিপিএম ১৯৫৯ সালে প্রথম ভোটে জিতে রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পরে পার্টি কর্মসূচিতে ধীরে ধীরে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি গুরুত্ব পেতে থাকে। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রথম ভাঙন চীন-ভারত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ১৯৬৪ সালে। যদিও ১৯৫৬ সালে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে ভাঙন তার প্রতিফলন ঘটে এদেশেও। রাশিয়ায় বিংশতি কংগ্রেসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ক্রুশ্চেভীয় তত্ত্ব বনাম চীনের মাও সে তুং-এর পার্টির বিপ্লবী রাজনীতি এদেশের পার্টিতেও আড়াআড়িভাবে যে ভাঙন আনে তা চূড়ান্ত চেহারা নেয় ১৯৬৪ সালে। রুশপন্থিরা ‘সিপিআই’ বা কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া আর ‘সিপিএম’ আপাতভাবে চীনপন্থি বলে পরিচিত হয়।
বস্তুতপক্ষে তার পর থেকেই এদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র সংগ্রাম ও ভোটের রাজনীতিতে ভাগ হয়ে যায়। জনগণের বড় অংশ যোগ দেয় সিপিএম-এ। অন্যদিকে ১৯৬৭ সালে শুরু হয় উত্তরবঙ্গের তরাই-এ নকশালবাড়ির কৃষক সংগ্রাম।
সিপিএম পার্টি কর্মসূচিতে ১১২-১১৩ ধারায় বদল এনে একসময় লিখিত ঘোষণা করে যে, জনগণের আশু সমস্যা সমাধান ও গণআন্দোলন বিকশিত করার তাগিদে সংসদীয় পথে ভোটের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাবে। ১৯৭৭ সালে বিপুল ভোটে জিতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় ক্ষমতায় এলো সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট। ততদিনে নকশাল আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত। ফলে বামেদের নির্বাচনী সাফল্য সমাজবিজ্ঞানের বড় অংশের মধ্যে ধারণা গড়ে দিল যে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথ মানেই পার্লামেন্ট নির্ভরতা। ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গের বাম বিকল্পের ইতি ও নেতিবাচক নানা দিক যত সামনে আসছে বা দীর্ঘ বাম রাজত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় একক চেষ্টায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাওয়ার পরে-পরেই নিঃসন্দেহে প্রশ্ন উঠে গেছে, ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতিই একমাত্র পথ কিনা তা নিয়ে।
অন্যদিকে আদিবাসী অধ্যুষিত বিহার দ-কারণ্যের বিরাট এলাকায় মাওবাদী রাজনীতির জনযুদ্ধের ডাক এদেশের বামপন্থি ন্যারেটিভে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়।
আপনি তাকে নৈরাজ্যবাদী-হঠকারী বলে উড়িয়ে দিতে যতই চেষ্টা করুন আদিবাসী জনজাতির ভেতরে মাওবাদীদের প্রভাব কতটা গভীর তা দূর থেকে কল্পনা করা কঠিন। কেরল বা ত্রিপুরায় না হলেও পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম-এর বড় সমস্যা তাদের টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত বাবুসুলভ রাজনীতি। নেতৃত্বে না আছে সংখ্যালঘু, না আদিবাসী বা বাগদী-বাউরি গোত্রের নিম্নবর্গের হিন্দু। যে সংখ্যালঘু মুসলিমরা এদেশের কমিউনিস্ট পার্টির গোড়াপত্তনের সময় ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়, এখন তাদের পার্টির ভেতরে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাওয়া কিন্তু সত্যিই অবাক করা ঘটনা।
সিপিএম-এর দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকার সামাজিক দ্বন্দ্ব যা ছিল তার খুব একটা কিছু পরিবর্তন হয়নি। বর্গা অপারেশন, খাসজমি উদ্ধার বা বণ্টন নিয়ে অনেক গালভরা কথা বলা হলেও তা কতটা মিথ বা বাস্তব তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একশ বছরে এটা পরিষ্কার যে গণ-আন্দোলন বাদ দিয়ে স্রেফ ভোটের রাজনীতি আর যাই হোক কমিউনিস্ট পার্টির একমাত্র পথ হতে পারে না। যেনতেন ভাবে ভোটের রাজনীতিতে বামেদের মধ্যে যেমন শৈথিল্য এনেছে তেমনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যথেষ্ট ক্ষতিও করেছে। আজ যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির রমরমা তার পেছনে ভোটপন্থি রাজনীতির অবদান কম নয়। গত বছর লোকসভা নির্বাচনে বামেদের ভোট কমতে কমতে মাত্র সাত শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সাংগঠনিক দিকেও যোগ্য লোকের পরিবর্তে নেতাদের চাটুকারেরা ওপর থেকে নিচ দখল করে নিল। পার্টি ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল। রাজনীতির জায়গা নিল বিশুদ্ধ অর্থনীতিবাদ। পাড়ায় পাড়ায় নতুন এক মাফিয়ারাজ জন্ম নিল পার্টির ছত্রছায়ায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় নিয়ে অনেক কথা বলা যেতেই পারে। কিন্তু দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে সিপিএম ও অন্য বাম দলগুলোর সংগঠনে ক্ষয় ধরেছিল বলেই বামেদের তথাকথিত বিকল্প মডেল মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা বড় শরিক সিপিএম ও অন্যরা স্বীকার না করলে সামগ্রিকভাবে বামপন্থি রাজনীতির কোনো আশু উন্নতি হবে বলে মনে হয় না।
বামেদের চিরাচরিত যে সমর্থক গোষ্ঠী এক সময় সারা দেশ শুধু নয়, সারা দুনিয়ায় বামেদের জনপ্রিয় করেছিল তার মূল হাতিয়ার ছিল গণমানুষের আন্দোলন। তা দ্রুত বদলে গেল। যে বামপন্থিরা ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে গণআন্দোলনে পুলিশ যাবে না। তারাই ধীরে ধীরে পুরোপুরি পুলিশ প্রশাসন নির্ভর হয়ে উঠল। পঞ্চায়েতিরাজ নিয়ে যে এমন শোরগোল করা হয় তা নিশ্চিত আংশিক সত্য। পুরোটা নয়। গ্রামীণ রাজনীতি কৌশলে পুরনো জোতদার পরিবার, সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে স্কুল শিক্ষকদের বড় অংশ কব্জা করে গ্রামীণ সর্বহারাদের শোষণ আগের মতোই বজায় রাখল।
একশ বছরের রাজনীতি নিয়ে ছোট পরিসরে বিস্তারিত বলা অসম্ভব। তবে যতই সমালোচনা থাক না কেন ভারতের রাজনীতিতে বামেদের অবদানও কম নয়। শুধুমাত্র সংস্কৃতি নিয়েই পাতার পর পাতা লিখে ফেলা যায়। শিল্প-সাহিত্য-নাটক-সিনেমা-সংগীত এমনকি সাংবাদিকতাতেও নতুন এক ধারার জন্ম দিয়েছে উপমহাদেশের বামপন্থি রাজনীতি। ইতিহাসে তা সোনার অক্ষরে লেখা আছে। থাকবেও। হাজার হাজার মানুষের শহীদ হওয়া, কত কত পরিবারের ত্যাগ স্রেফ আদর্শের জন্য, তা নিয়েই লেখা হতে পারে এক মহতী উপন্যাস।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
sdastidar27@gmail.com