হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মুনাফা দেখায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফাইন ফুডস লিমিটেড। কিন্তু উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণ ইস্যুতে কোম্পানিতে আধিপত্য হারানোর আশঙ্কায় হিসাব বছর শেষে নামমাত্র মুনাফা দেখাল বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ। এর মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বর্তমান পর্ষদ, যাদের হাতে মাত্র ৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এর আগে গত বছরও পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত আরেকটি কোম্পানি ইনটেক লিমিটেড একই ধরনের প্রতারণা করে শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে।
গতকাল ফাইন ফুডস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ২০১৯-২০ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে লভ্যাংশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোম্পানির পর্ষদ ওই হিসাব বছরের জন্য মাত্র ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুরো বছরে আয় দেখিয়েছে মাত্র ২৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ১৮ পয়সা। অথচ ২০১৯-২০ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত (জুলাই ’১৯ থেকে মার্চ ’২০) ফাইন ফুডসের নিট মুনাফা ছিল ২ কোটি ২ লাখ টাকা। এ সময় ইপিএস ছিল ১ টাকা ৪৪ পয়সা।
কোম্পানিটির প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে মাছ চাষ। কিশোরগঞ্জে কোম্পানির মূল প্রজেক্ট। এ ছাড়া ময়মনসিংহে আরেকটি প্রকল্প রয়েছে। সব মিলিয়ে ফাইন ফুডসের প্রায় ২২১ বিঘা জমি রয়েছে। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে কোম্পানিটির পরিচালন ব্যয় ছিল ৩৭ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ হিসাব বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে কোম্পানির কোনো আয় না হলেও নিট মুনাফা এতটা কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। যদিও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মাছ ধরা ও বিক্রি নিষেধ ছিল না। তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ২ কোটি ২ লাখ টাকা নিট মুনাফা শেষ প্রান্তিকে এসে কীভাবে ২৬ লাখ টাকায় নেমে গেল, তা নিয়ে ফাইন ফুডস কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দিতেও রাজি হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে ফাইন ফুডসের কোম্পানি সচিব সোহেল হোসেইনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে শুধুমাত্র ২০১৯-২০ হিসাব বছরের জন্য ১ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা ও বার্ষিক ইপিএস ১৮ পয়সার কথা জানান। আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে কোনো বাখ্যা দিতে রাজি হননি। এ বিষয়ে কোম্পানির চেয়ারম্যান সুজিত সাহা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলামের কাছ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২৭ অক্টোবরের মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নতুন করে যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, তাতে কোম্পানির বর্তমান পর্ষদের ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর জেরে বার্ষিক নিট মুনাফা কম দেখিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ন্যূনতম শেয়ার ধারণে এক বছরের সময় চেয়ে এসইসিকে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু এসইসির বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই বাজার থেকে দুটি প্রতিষ্ঠিত গ্রুপ ফাইন ফুডসের ৬০ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনে নেওয়ায় কোম্পানিটির বর্তমান পর্ষদ বিপাকে পড়ে যায়। পরিচালক পদ হারানোর শঙ্কা ও এসইসির ওপর বিদ্বেষ থেকেই এমনটি করেছে বলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা মনে করছেন।
এর আগে গত বছর ইনটেক লিমিটেডও একই ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এ কোম্পানিরও পরিচালনা পর্ষদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। এটি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি হলেও তাদের প্রধান আয়ের উৎস ছিল মাছ চাষ। কোম্পানিটি ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ১ টাকা ৩৪ পয়সা ইপিএস দেখালেও হিসাব বছর শেষে মাত্র ৩৯ পয়সা ইপিএস দেখায় এবং সেই বছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে করে শেয়ার দরে বড় ধরনের পতন ঘটায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক লোকসানের মধ্যে পড়েন। অবশ্য সম্প্রতি ন্যূনতম শেয়ার না থাকায় ইনটেকের প্রায় সব পরিচালককে পদ হারাতে হয়েছে।
২০১৯ সালের ৩০ জুন দেওয়া তথ্যানুযায়ী ফাইন ফুডসে পাঁচজন পরিচালক রয়েছেন। এর মধ্যে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য সবাই স্বতন্ত্র পরিচালক। নজরুল ইসলামের কাছে কোম্পানির মোট শেয়ারের ৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ রয়েছে। আর কোম্পানির পরিচালক সুজিত সাহার কাছে রয়েছে মাত্র ২৬০টি শেয়ার। এ ছাড়া আরেক স্বতন্ত্র পরিচালক মো. আলম বিশ্বাসের কাছে ৩ হাজার ৬৬০টি শেয়ার রয়েছে। এসইসির নির্দেশনা পরিপালন করতে হলে কোম্পানির মোট শেয়ারের ২৪ দশমিক ১ শতাংশ কিনতে হবে। কিন্তু কোম্পানির বর্তমান পরিচালকরা কোনো শেয়ার কেনার ঘোষণা দেননি।