কর ফাঁকি রোধ করতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বড় লেনদেনের তথ্য যাচাই করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগ। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকি উদঘাটনে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্প্রতি বেশকিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুরুতে বছরে শত কোটি টাকার বেশি যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন রয়েছে, তাদের তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে চাওয়া হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্যও পর্যালোচনা করা হবে। প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট প্রদানের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। এর মাধ্যমে ফাঁকি উদঘাটন করে দাবিনামা জারি করা হবে।
সূত্র জানায়, এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি বের হয়েছে। রাজধানী ও আশপাশের ব্যবসা অধ্যুষিত জেলা এবং চট্টগ্রামে অভিযান পরিচালনা করেছেন ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সর্বশেষ এ ধরনের অভিযানে অনলাইন খাবার বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। ফুডপান্ডার গুলশান-২ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ভ্যাট ফাঁকির এ তথ্য পান তারা। ভ্যাট গোয়েন্দার উপপরিচালক নাজমুন্নাহার কায়সার ও সহকারী পরিচালক মো. মহিউদ্দীন অভিযানটি পরিচালনা করেন। গতকাল এই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
ফুডপান্ডার অফিসের কম্পিউটার থেকে জব্দকৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২৭ কোটি ৫৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫১৭ টাকার বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়। এই একই সময়ে প্রতিষ্ঠান গুলশান ভ্যাট সার্কেলে দাখিলপত্রে ১৫ কোটি ৬৫ লাখ ১৯ হাজার ৯৭২ টাকা বিক্রয়মূল্য প্রদর্শন করেছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি গত ৮ মাসে ১১ কোটি ৯৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৪৫ টাকা বিক্রয়তথ্য গোপন করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শতকোটি টাকার ওপরে বার্ষিক লেনদেনের তথ্য চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে কি না, কিংবা নিবন্ধন থাকলে প্রতি মাসে রিটার্ন দেয় কি না তা যাচাই করা হবে। রিটার্ন জমা দিলে ঐ তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য সাযুজ্যপূর্ণ না হলে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। লেনদেনের পক্ষে যথাযথ প্রমাণ না দেখাতে পারলে তা বিক্রি হিসেবে বিবেচনা করে তার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট চাওয়া হবে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে একবার ভ্যাট গোয়েন্দা ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে শতকোটি টাকার ওপরে লেনদেন হওয়া ব্যবসায়ের তথ্য চায়। এছাড়া জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাটের তথ্য যাচাই করার নির্দেশনা দিয়ে একটি চিঠি দেয়। অবশ্য করোনার ভয়াবহতা এবং ব্যাংকগুলোর আপত্তির কারণে পরবর্তী সময়ে ওই চিঠি প্রত্যাহার করা হয়।
গত কয়েক মাসে ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগ কর ফাঁকির অভিযোগে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে। এ সময় নথিপত্র ও বিক্রির তথ্য পর্যালোচনা করার পর শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে এসআর গ্রুপের পাঁচটি হোটেল এবং রেস্টুরেন্টের প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার সমপরিমাণ গোপন বিক্রির তথ্য উদঘাটন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো ৩৬ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ। এছাড়া ফরিদপুরের পান্না ব্যাটারি, চট্টগ্রামের অ্যামব্রোশিয়া হোটেল, মগবাজার ও ধানম-ির দুটি মদের বার, ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল ও বিএসবি গ্লোবাল, বারিধারার ফ্রন্টডেস্ক লিমিটেড, মোংলা বন্দরে খালাস হওয়া চার কন্টেইনার পোস্তদানা আটক, বনানীর অভিজাত চশমার দোকান, গুলশানের দ্য জাভেদ হাবীব বিউটি পার্লার, জাহিদ খান ব্রাইডাল মেকওভার ও ব্রাইডাল স্টুডিও এবং অ্যারোমা থাই স্পা, ফরিদপুর টোব্যাকো, মোহাম্মদপুরের নিজাম ইলেক্ট্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ, কদমতলীর শরীফ ইলেক্ট্রিক্যাল উল্লেখযোগ্য। ফেইসবুকের এদেশীয় এজেন্টের ফাঁকি উদঘাটনের পর ওই অর্থ তারা পরিশোধও করেছে।
এছাড়া নথিপত্র যাচাই করে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের ৯৭৮ কোটি টাকার ফাঁকি উদঘাটন করেছে। এর মধ্যে বেশকিছু রাজস্ব আদায়ও হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার যে পরিমাণ ভ্যাট পাওয়ার কথা, প্রকৃতপক্ষে সরকারের ঘরে তা আসছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের শতকোটি টাকার ওপর লেনদেন থাকলেও ঐ সব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরই নেই। আবার যাদের নিবন্ধন রয়েছে, তাদেরও এনবিআরে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত লেনদেন কিংবা মূল্য সংযোজনের অনেক ব্যবধান থাকে। এ প্রক্রিয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছে। ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ের ফলে এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানের ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।