স্বামীর ঋণে সর্বস্ব খোয়া

গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গৃহবধূ

সুদে নেওয়া ঋণ ফেরত দিতে না পেরে স্ত্রী সুমি বিশ্বাসকে (৩২) মহাজন ইসমাইল ম-লের (৪৩) হাতে তুলে দেন স্বামী সুজয় বিশ্বাস (৪০)। সুমি বিশ্বাস থেকে ধর্ম বদলে সুমি খাতুন ইসমাইলের সংসারেই থিতু হতে চান। কিন্তু ইসমাইল ও তার আগের স্ত্রী-সন্তানদের নির্যাতনে তা হয়নি। এক পর্যায়ে ইসমাইলকে তালাক দিলে সুমির ওপর খড়গ নেমে আসে। ইসমাইল চুরিসহ তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দেয়। বর্তমানে সাত বছরের মেয়েকে রেখে গ্রাম ছেড়ে সুমি মাগুরা শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

সুমির বাড়ি মাগুরা সদরের বেরইল পলিতা ইউনিয়নে। আট বছর আগে পার্শ্ববর্তী মহম্মদপুর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের পান ব্যবসায়ী সুজয় বিশ্বাসের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছরের মাথায় এ দম্পতির কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।

সুমি জানান, বিয়ের পাঁচ বছর পর জানতে পারেন মহম্মদপুরের গবরনাদা এলাকার ইসমাইল মন্ডল থেকে ৬০ হাজার টাকা ধার নিয়েছেন তার স্বামী। এ টাকা সুজয় শোধ করেছেন। তবে ইসমাইলের দাবি, তিন বছরে সুদে-আসলে ৯ লাখ টাকা হয়েছে, যা সুজয় দেয়নি। পাওনা আদায়ে মরিয়া দুই সন্তানের জনক ইসমাইলের চোখ পড়ে সুমির ওপর। এক পর্যায়ে টাকা না দিতে পারলে স্ত্রীকে দেওয়ার প্রস্তাব করে। শুরুতে সুজয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও দুই বছর আগে কৌশলে তাকে যশোরে চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে নিয়ে গিয়ে ইসমাইলের হাতে তুলে দেন বলে জানান সুমি।

এরপর ইসমাইল সুমিকে বিয়ে করেন। ঢাকায় নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় সংসার পাতেন। মাস দুয়েক পর ইসমাইল তাকে নিয়ে মাগুরায় গ্রামের বাড়ি ফেরেন। কিন্তু ইসমাইলের প্রথম স্ত্রী-সন্তানরা সুমিকে মেনে নেননি। নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে। নির্যাতন সইতে না পেরে পাঁচ মাস আগে বাড়ি থেকে পালান সুমি। এরপর ইসমাইলকে তালাক দেন তিনি।

এরপরও ইসমাইল সুমির পিছু ছাড়ে না। ফোন ছাড়াও কর্মস্থলে গিয়ে ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন। এক পর্যায়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মীমাংসার আবেদন করেন সুমি। গত ৭ অক্টোবর দুপক্ষের শুনানি শেষে জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সুমিকে উত্ত্যক্ত না করতে ইসমাইলকে সতর্ক করেন। কিন্তু নাছোড় ইসমাইল এরপর সুমির নামে চুরি, অর্থ আত্মসাৎসহ তিনটি মামলা দেন।

এ বিষয়ে সুজয় বিশ্বাস বলেন, ‘টাকা পরিশোধ করলেও ইসমাইলের কুনজরে পড়ে আমার স্ত্রী। তার প্রস্তাব না মানলে নানাভাবে হুমকিধমকি দেন। এক পর্যায়ে যশোরে স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলে ইসমাইল আমাকে মারধর করে মাস্তান দিয়ে সুমিকে তুলে নিয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তুলে নেওয়ার পর আমি মামলা করেছি। স্ত্রীকে পাওয়ার আশায় এখনো বিয়ে করিনি। আমি আমার স্ত্রীকে ফেরত চাই।’

তবে সুমির ভাষ্য, যে স্বামী তার সঙ্গে প্রতারণা করে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন, সেখানে আর তিনি ফেরত যেতে চান না।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইসমাইল মন্ডল বলেন, ‘আমি কোনো সুদের ব্যবসা করি না। সুমি স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়ে আমাকে বিয়ে করেন। পরে মনোমালিন্য দেখা দেওয়ায় তালাক দেন। এখন আমি আমার স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাই।’

জেলা লিগ্যাল এইডের আইনজীবী শাহিনা আক্তার ডেইলি বলেন, ‘স্ত্রী তালাক দিলে ৯০ দিনের মধ্যে কার্যকর হয়ে যায়। আইনগতভাবে ইসমাইল আর সুমিকে স্ত্রী দাবি করতে পারেন না। এখন ইসমাইল তাকে উত্ত্যক্ত করলে সেটি বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।’

মাগুরার পুলিশ সুপার খান মুহাম্মদ রেজওয়ান বলেন, ‘ওই নারী পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’