কক্সবাজারের কলাতলীতে এক কাঠা জমির দাম কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা। সেখানকার ঝিলঞ্জা মৌজায় গণপূর্ত বিভাগের ৬৭১ কাঠা জমি দখল করে নিয়েছে একটি প্রভাবশালী মহল। ওই জমির বাজারমূল্য ৩৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নোয়াখালী সদরেও কাঠাপ্রতি জমির মূল্য কমবেশি ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। সেখানে গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ১ হাজার ২১৯ কাঠা জমি বেদখলে রয়েছে। যার বাজার মূল্য কমপক্ষে ৫০০-৬০০ কোটি টাকা। একইভাবে রাজধানীর মিরপুরে সংস্থাটির প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের ৭৪ কাঠা, খুলনা গণপূর্ত বিভাগে প্রায় ১ দশমিক ৮৮ একর, যশোর গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ২৮ বিঘা, ঢাকার শেরেবাংলা নগরে দশমিক ১১ একর ও পটুয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে প্রায় ৩০০ বিঘা জমি বেদখলে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় সব ধরনের জমি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখান থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সারা দেশে আমাদের কী পরিমাণ জমি বেদখলে রয়েছে এর একটি তালিকা তৈরি করব। সেই মোতাবেক সব তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ ভূমি আমাদের বেদখলে রয়েছে। এগুলো আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ধার তৎপরতা চালানো শুরু করেছি। কিছু জমি ইতিমধ্যে সরকারের অনুকূলে আনাও হয়েছে। আশা করছি বাকি জমিও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেলা শহরে থাকা দামি জমিগুলোর প্রতি প্রভাবশালী মহলের টার্গেট থাকে। তারা জমি দখলে নিয়েই মামলা করে দেয়। এমন বেশকিছু মামলায় সরকারপক্ষে রায় এসেছে। কিন্তু দখলদাররা আবার আপিল করে মালিকানা কব্জায় রেখেছে।’
গণপূর্তের অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সংস্থাটির ৮৬ বিভাগের অধীনে ৮ হাজার ৮১৬ দশমিক ৬ একর জমি রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাতটি বিভাগে ৪৪১ বিঘা জমি ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দখল করে নিয়েছে। ঢাকা ও জেলা সদরে থাকা এসব জমির প্রতি কাঠা ৩০ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজারমূল্য রয়েছে। সেই হিসাবে সংস্থাটির কমপক্ষে ৩ হাজার কোটি টাকার জমি এই মুহূর্তে বেদখলে রয়েছে।
তারা আরও জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সব জমি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা শুরু হয়েছে। তারা ৮৬টি বিভাগের বিস্তারিত তথ্য পেয়েছেন। এর মধ্যে সাতটি বিভাগের বেদখলের চিত্র উঠে এসেছে। আর অনেক জায়গায় গণপূর্তের জমি জেলা প্রশাসক বিধিবহির্ভূতভাবে রিজিউম বা পুনঃগ্রহণ করে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে দিনে দিনে শত শত বিঘা জমি হাতছাড়া হচ্ছে সংস্থাটির। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে প্রায় আড়াইশ বিঘা জমি রিজিউম হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৫ তারিখ গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবকে একটি চিঠি দেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মো. সাইফুর রহমান। চিঠিতে বলা হয়, পূর্তের মালিকানাধীন কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মহিনন্দ মৌজার জেএল নং ২৭, আরএস খতিয়ানের ৩৭৪৩ দাগে মোট প্রায় ৯০ বিঘা জমি রয়েছে। এ জমি রিজিউম করার জন্য কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেয়। একই বছরের ২৭ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় বিভাগীয় জেলা ও উপজেলা সদরে গণপূর্তের মালিকানাধীন অধিগ্রহণকৃত জমি রিজিউম না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু জেলা ভূমি প্রশাসন চলতি বছর ১ সেপ্টেম্বর এ জমি রিজিউম করে গেজেট প্রকাশ করে।
রিজিউম সম্পর্কে পূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের বলা হয়েছে যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ ও বিধিবিধান মেনে যেন রিজিউম করা হয়।’
কর্মকর্তারা আরও জানান, গণপূর্তের মালিকানাধীন আরও বেশকিছু জমি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনুকূলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় ১২ বিঘা জমি সরকারি দুটি সংস্থার অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়েছে। এমনভাবে ঢাকাসহ সারা দেশে পূর্তের বেশকিছু জমি সরকারি সংস্থার অনুকূলে দেওয়া হয়েছে। অনেক খেলার মাঠ, পার্কসহ গণপরিসরও অন্য সংস্থার হাতে যাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের জমির পরিমাণ কমছে।
তারা আরও জানান, মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের বেশিরভাগেরই ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষতা নেই। তারা নানা উন্নয়নসংক্রান্ত কারিগরি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সরকারি অন্য সংস্থা ও প্রভাবশালী মহল জমি দখলে নিয়ে যায়। আবার যেকোনো প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকরাও সবার আগে পূর্তের জমি নিতে চান। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসকদের বাইরে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীরা কোনো পদক্ষেপও নিতে পারেন না।
গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রকৌশলীদের ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। সেই সঙ্গে সংস্থাটির বেদখলে থাকা জমি ফিরিয়ে আনতে আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে। সরকারি এক কাঠা জমিও কারও দখলে থাকতে দেওয়া হবে না।’
কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলাতলীতে আমাদের বেশকিছু জমি বেদখলে রয়েছে। আমরা এগুলো উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছি।’