লালমনিরহাটের আদিতমারীর অমল চন্দ্র রায় (৪৮) অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে কোনোরকমে টেনেটুনে সংসার চালাচ্ছেন। স্বপ্ন দেখতেন নিজে কিছু করে সংসারে সচ্ছলতা আনার।
সেজন্য সরকারের ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের (বর্তমানে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক) গ্রাম উন্নয়ন সমিতিতে টাকা জমাতে থাকেন। আশায় ছিলেন ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়ে সংসারে সচ্ছলতা আনবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। কেননা তার নামে দশ হাজার টাকা ঋণ বরাদ্দ ও ঋণের টাকা উত্তোলন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে তথ্য অমল নিজেই জানেন না। সম্প্রতি একজন মাঠ সহকারী বাড়িতে গিয়ে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধের কথা বলতেই তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। আর শুধু অমলই নন, একইভাবে ঋণ বরাদ্দের পর ঋণের টাকা উত্তোলন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যার নামে ঋণ তিনি কিছুই জানেন না এমন বেশ কিছু জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের লালমনিরহাটের আদিতমারী শাখায়। আর এসব জালিয়াতি সুকৌশলে করেছেন ওই শাখার জুনিয়র অফিসার নগেন্দ্র নাথ রায়।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে ঋণ না নিয়েও ঋণের খাতায় নাম উঠেছে এমন বেশ কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন আদিতমারীর ভাদাই ইউনিয়নের আরাজী দেওডোবা গ্রাম উন্নয়ন সমিতি-২ এর সদস্য পর্বানন্দ, মিলন কুমার, অবিনাশ চন্দ্র রায়, সিরাজুল হক, ইউসুফ আলী ও কনক চন্দ্র বর্মন। তারা অভিযোগ করে বলেন, এক বছরেরও বেশি সময় আগে তাদের নামে ঋণ বরাদ্দের পর তা উত্তোলনও করা হয়েছে। কিন্তু ঋণ উত্তোলনের তথ্য সম্প্রতি তারা কিস্তি আদায়কারী মাঠ সহকারীর কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। আর আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার (বরখাস্ত) নগেন্দ্র নাথ রায় তার বিরুদ্ধে ওঠা জালিয়াতির সব অভিযোগ অকপটে স্বীকার করে বলছেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে তিনি দ্রুতই ফয়সালা করে নেবেন। এরইমধ্যে গত ২২ অক্টোবর তিনি ভুক্তভোগী কনক চন্দ্র, ইউসুফ আলী ও সিরাজুলের ঋণের টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আদিতমারী পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ফরহাদ আলী রানা গত ১২ আগস্ট জুনিয়র অফিসার নগেন্দ্র নাথ রায়কে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন। ওই নোটিসে বলা হয়, নগেন্দ্র নাথ রায় কর্মরত থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে সদস্যদের হয়রানি, ঋণ প্রদান না করা এবং কিস্তি ও সঞ্চয় আদায় করে তা সরকারের কোষাগারে জমা দেননি। এ বিষয়ে তাকে মৌখিক ও লিখিতভাবে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও তিনি কর্ণপাত করেননি। এরইমধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে চাকরি দেওয়ার নাম করে এক নারীর কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন নগেন্দ্র নাথ রায়। এরপর কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবিধিমালা মোতাবেক তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। নগেন্দ্র নাথ পরে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে ফের অফিসের কাজ শুরু করেন। কিন্তু তিনি দাপ্তরিক কাজ করলেও কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করতে পারছেন না।
নোটিসে নগেন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ১৫ সদস্যের নামে দেড় লাখ টাকা, সবদল গ্রাম উন্নয়ন সমিতির ৬ সদস্যের নামে দেড় লাখ টাকা, সাপ্টিবাড়ি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আমার বাড়ি আমার খামার দলের ৫ সদস্যের নামে এক লাখ বিশ হাজার টাকা এবং মাঝিটারী গ্রাম উন্নয়ন সমিতি-৩ এর সদস্যদের নামে চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন করে তা ওই সদস্যেদের মাঝে বিতরণ না করা। এছাড়া দুর্গাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর আমার বাড়ি আমার খামার সমিতির ২ সদস্যের ২৮ হাজার টাকা এবং সাপ্টিবাড়ি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বাড়ি একটি খামার সমিতির ঋণ পরিশোধ বাবদ ২৩ হাজার টাকা জমা পড়লেও সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করেননি নগেন্দ্র। এর বাইরে মাঠ সহকারী বিশ্বনাথ রায়ের কাছ থেকে সমিতির সদস্যদের জমা দেওয়া এক লাখ বার হাজার আটশ পঞ্চাশ টাকা, মাঠ সহকারী সুজাউল মোল্লার আদায় করা তিন লাখ নয় হাজার চারশ টাকা এবং আরেক মাঠ সহকারী শাহজামালের আদায় করা পঁচিশ হাজার চারশ টাকা জমা নিলেও সেই টাকাগুলো সরকারি কোষাগারে জমা করেননি নগেন্দ্র নাথ। এসব অনিয়মের বাইরেও তিনি আরও অনেক সদস্যের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে সেই ঋণের টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
প্রকল্পের ভুক্তভোগী সদস্য এবং আদিতমারী আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের একাধিক মাঠ সহকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগেন্দ্র নাথ রায় প্রতিটি দলের সভাপতিকে কৌশলে ম্যানেজ করে সদস্যদের ঋণ আবেদনে স্বাক্ষর করে নিয়ে ঋণের টাকা তুলে নিতেন। এরপর সদস্যদের ঋণ হচ্ছে হবে বলে দিনের পর দিন ঘোরাতেন।
জালিয়াতির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নগেন্দ্র নাথ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়গুলো আস্তে আস্তে সমাধান করা হচ্ছে। দ্রুতই সবার সঙ্গে ফয়সালা করে নেব।’ এ বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্যও এই প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন তিনি।
অন্যদিকে আদিতমারী আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ফরহাদ আলী রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুনিয়র অফিসার পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে নগেন্দ্র নাথ বরখাস্ত আছেন। এখন তিনি এই অফিসে কর্মরত থেকে দাপ্তরিক কাজ করলেও কোনো ফাইলপত্রে স্বাক্ষর করতে পারছেন না। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট তাকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই বিষয়গুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। বিষয়টি জেলা অফিসকে অবহিত করেছি।’
আর আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আদিতমারী আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের সভাপতি মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়গুলো সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমি তেমন কিছুই জানি না। তবে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ কিংবা ঋণগ্রহীতার নামে ঋণ তুলে নেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’