দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর অবস্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে দলের ভেতরে সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি কাজ করলেও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করেন দল ও সরকারকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে ও ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হলে ‘অ্যাকশন মুডের’ কোনো বিকল্প নেই। এতে জনগণের আস্থা অর্জন করাও সম্ভব হবে। আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর মধ্যে ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাব দেখা দিয়েছে। সেই অংশ দল ও সরকারকে সময়ে সময়ে বেকায়দায় ফেলছে। ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করতে কিছু আগাছাও ভর করেছে আওয়ামী লীগে। ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাবের নেতাকর্মী ও দলের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া আগাছা পরিষ্কার করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
দলীয় সভাপতির এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তারা আরও বলেন, দলের কিছু নেতাকর্মীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড ও আচরণ দলীয় সভাপতির দৃষ্টিগোচর হয়। লাভ-ক্ষতির হিসাব করেই কঠোর অবস্থানে গেছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জনগণের দল। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা আওয়ামী লীগের কাছেই বেশি। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ কেউ করবেন সেটা মেনে নেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্যায়কারী যেই হোক কাউকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দলের বেশকিছু জনপ্রতিনিধির ব্যাপারে বিশেষ নজর রাখছেন। শেখ হাসিনার এ অ্যাকশন মুডে দলের আরও অনেক জনপ্রতিনিধিও কুপোকাত হবেন। পাশাপাশি দলের ভেতরে থাকা কিছু আগাছাও পরিষ্কার হবে। অপরাধী যত বড় নেতাই হন অপরাধের শাস্তি হবেই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, চলতি মাসে বড় তিনটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। যা আওয়ামী লীগের ভেতরে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এর একটি ফরিদপুরের ভাঙ্গায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সংসদ সদস্যের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, পাবনায় দলের এক উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে আরেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হাতাহাতির ঘটনা এবং সর্বশেষ ঢাকায় নৌবাহিনীর কর্মকর্তার সঙ্গে এমপিপুত্রের মারামারির ঘটনা। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশাও আছে। হতাশাগ্রস্ত নেতাকর্মীরা বলছেন, অপরাধের কারণ ও প্রকৃত ঘটনা না জেনে একতরফা দলীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতখানি যৌক্তিক? ব্যবস্থা নেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা না হলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা জনগণের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়বেন। এতে দলীয় রাজনীতির ক্ষতি হবে।
তিনি আরও বলেন, তৃণমূল নেতারা বলছেন, অপরাধ করলে নিশ্চয়ই শাস্তি হবে। তবে অপরাধের ধরন-কারণ এসব নিশ্চয়ই বিবেচনায় আনতে হবে। তা না হলে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে যেমন ভুল মেসেজ যাবে তেমনি জনগণের কাছেও দলের নেতাকর্মীরা গ্রহণযোগ্যতা হারাবেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনের শাসনে কঠোর। অন্যায় তার কাছে অন্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়। এখানে কে মন্ত্রী, কে মন্ত্রীর ছেলে, কে এমপি, কে এমপির ছেলে এসব বিবেচনা করেন না। এ ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতিও আমলে নেন না তিনি। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা চান, তার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আচার-আচরণে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।’
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের কোনো নেতাকর্মীর আচার-আচরণে বা কর্মকাণ্ডকে ইস্যু করে কোনো অসন্তোষ সৃষ্টি হোক এবং সরকার কোনো ধরনের চাপে পড়ুক, তা চান না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ড ঘটলে তা অঙ্কুরেই বিনাশ করতে চান। এসব ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি করার কারণ হয়ে যেতে পারে। তাই এসব অঘটনগুলোর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, এমন কিছু অভিযোগও আছে দলের নেতাকর্মীদের সরকারি কর্মকর্তারা পাত্তা দেন না। এ কারণেও কিছু ঘটনা ঘটছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভুল বোঝাবুঝির কারণ অনুসন্ধান ও নিরসনের জন্যও কাজ করা হবে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, কোনো ধরনের চাপ নিতে চায় না আপাতত সরকার। তাই যেকোনো মূল্যে এ ধরনের ঘটনাগুলোর লাগাম টানতে চান দলীয়প্রধান। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোতে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে যেতে পারে এবং তাদের ইন্ধনে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুততার সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো এড়িয়ে যেতে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।