আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সন্ত্রাসী বাহিনীর উত্থান এবং মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই খবর মিলল টাকা হলেই আইনের ফাঁকফোকর গলে কেনা যাচ্ছে মারাত্মক শক্তিশালী অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোই এসব অস্ত্র আমদানি এবং বিক্রি করছে। আর বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সের বিপরীতে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কেনাবেচা হচ্ছে শক্তিশালী এসব আগ্নেয়াস্ত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এসব সম্ভব হচ্ছে অস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান ও প্রজ্ঞাপনের অস্পষ্টতার সুযোগে। পুলিশ বলছে, অনেক মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীরাও ব্যবহার করছে এসব সেমি-অটোমেটিক অত্যাধুনিক পিস্তল যা বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করে থাকে। অন্যদিকে, এসব মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর কাছে চলে যাওয়ারও আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টিকে দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্রের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে আইন ও বিধিবিধানের ফাঁক গলে অবৈধ অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি কীভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চোখ এড়িয়ে গেল?

সম্প্রতি রাজধানীতে এক মাদক কারবারিকে আটকের পর তার কাছ থেকে একটা মিলিটারি গ্রেডের পয়েন্ট-টুটু বোরের একটি সেমি-অটোমেটিক উজি পিস্তল উদ্ধারের সূত্র ধরে দেশে এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির বিষয়টি সামনে আসে। ওই মাদক কারবারি পয়েন্ট-টুটু বোর রাইফেলের লাইসেন্সধারী। তিনি বৈধ লাইসেন্সের বিপরীতেই এই অস্ত্রটি কিনেছিলেন। কিন্তু আদতে এটি রাইফেল নয়। পুলিশ উদ্ধার করা উজি পিস্তলের বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়েছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে উজি পিস্তল একটি মিলিটারি গ্রেডেড অস্ত্র। বেলজিয়াম আর্মড ফোর্সেস ও ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সে এই অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের (পিস্তল) চেয়ে এটি অত্যাধুনিক অস্ত্র (পিস্তল)। কারণ এর ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা ২০ রাউন্ড। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত পিস্তলের সর্বাধিক ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা ১৫ রাউন্ড। মতামতে আরও বলা হয়, এটি ক্ষুদ্রাস্ত্র শ্রেণির আগ্নেয়াস্ত্র। আপাতদৃষ্টিতে এটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ভিআইপিদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া অস্ত্রের লাইসেন্সে ক্যালিবার ছাড়া অস্ত্রের ধরনও সুর্নির্দিষ্ট থাকা প্রয়োজন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা তদন্তে নেমে জানতে পেরেছেন ২০১৫ সাল থেকে গত ৫ বছরে রাজধানীর লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্রের ৬টি প্রতিষ্ঠান মোট ১১১টি পয়েন্ট-টুটু বোরের উজি পিস্তল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৫৩টি উজি পিস্তল তারা লাইসেন্সধারী ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এখনো ৫৮টি তাদের হাতে আছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এগুলো আমদানি করেছে, তারা হলো এমএইচ আর্মস কোং, মঈন আর্মস কোং, আহম্মদ হোসেন আর্মস কোং, মেসার্স তোজাম্মেল হোসেন কোং, কে আহমদ আর্মস অ্যান্ড কোং, শফিকুল ইসলাম আর্মস অ্যান্ড কোং। বাংলাদেশে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় মারাত্মক শক্তিশালী এই আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে গেলে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সার্বিক বিবেচনায় এ ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈধ লাইসেন্সের বাইরে জালিয়াতির মাধ্যমে অত্যাধুনিক এসব অস্ত্র যদি সাধারণ মানুষের হাতে চলে যায়, আর সেগুলো যদি ট্র্যাকিং করে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রেতারা কীভাবে এমন মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র মানুষের কাছে বিক্রি করে আসছে আর অস্ত্রের লাইসেন্সধারীরা সেসব কিনছে সেটাই সবচেয়ে বড় বিস্ময়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনেশন ডিলারস অ্যান্ড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। তার দাবি, অস্ত্রগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে বৈধভাবেই আমদানি করা হয়েছে। এগুলো পয়েন্ট-টুটু বোরের রাইফেল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আমদানি হয়েছে, কিন্তু অস্ত্রগুলোর গায়ে পিস্তল লেখা রয়েছে। এখানেই কিছুটা ফাঁক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফাঁকি ঠেকাতে হলে লাইসেন্সে আগ্নেয়াস্ত্রের ধরন অর্থাৎ পিস্তল অথবা রাইফেল ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার পাশাপাশি ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতাসহ আরও কিছু বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার  যেতে পারে। এসব বিধিবিধান সংশোধনের পাশাপাশি অনতিবিলম্বে বিক্রি হয়ে যাওয়া শক্তিশালী উজি পিস্তলগুলো কাদের কাছে রয়েছে সেটা অনুসন্ধান করে সেসব জব্দ করা জরুরি। একইসঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশের লাইসেন্সধারী বৈধ অস্ত্র ব্যবসার ৮৪টি প্রতিষ্ঠান এবং সরাসরি বিদেশ থেকে বৈধ অস্ত্র আমদানিকারক ১৪ প্রতিষ্ঠানের ওপরও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।