করোনায় ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় প্রায় সব কোম্পানির পণ্য বিক্রি কমে গেছে। তবে লকডাউন-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। এ সময়ে দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কোনো কোনো পণ্য বিক্রিতে কিছুটা সাফল্য পেয়েছে। তবে সার্বিকভাবে বেশির ভাগ কোম্পানি পণ্য বিক্রি থেকে আয় হারালেও উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এনে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।
চলতি মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ায় দেশব্যাপী টানা ৬৬ দিনের লকডাউনে ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ সময় অধিকাংশ শিল্প কারখানা বন্ধ থাকায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কোম্পানিগুলো লোকসানের মুখে পড়ে। তবে এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও ব্যতিক্রম ছিল বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। যদিও এ সময়ে তালিকাভুক্ত ১২টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ১০টির পণ্য বিক্রি ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তবে বিক্রিতে ধস নামলেও ১০টি বহুজাতিক বেশির ভাগ নিট মুনাফা ধরে রাখতে সমর্থ হয়। অবশ্য মুনাফার প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক হারে কমে যায়।
লকডাউন-পরবর্তী সময়ে ব্যবসা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ফিরে পেয়েছে অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানি। এ সময়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভোগ্যপণ্য ও নির্মাণ খাতের কোনো কোনো কোম্পানির পণ্য বিক্রির পরিমাণ বাড়তে দেখা গেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১২টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ৭টির পণ্য বিক্রি থেকে আয় কমেছে। এর মধ্যে নিট মুনাফা কমেছে মাত্র চারটির। বিপরীতে আট কোম্পানির নিট মুনাফা বেড়েছে ২ থেকে ৭১ শতাংশ পর্যন্ত। এসব কোম্পানি ব্যয় সংকোচন ও পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়করে সুবিধা পাওয়ায় নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ সময়ে নিট মুনাফায় সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয় লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডের। আগের বছরের তুলনায় চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয় ৭১ শতাংশের বেশি। বার্জার পেইন্টসের নিট মুনাফা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। গ্রামীণফোন, ম্যারিকো, লিন্ডে বাংলাদেশ ও রেকিট বেঙ্কিইজারও মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
লকডাউনের কারণে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের পণ্য বিক্রি ৪১ শতাংশ কমলেও পরবর্তী প্রান্তিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসেছে কোম্পানিটি। তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানির পণ্য বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ে। এ সময়ে উৎপাদন ও আয়কর বাবদ কম ব্যয় হওয়ায় কোম্পানিটির নিট মুনাফায় উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের নিট মুনাফা ২৬ শতাংশ কমলেও তৃতীয় প্রান্তিকে ৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিলম্বিত কর সুবিধার কারণে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে কোম্পানির আয়করের পরিমাণ কমেছে।
মহামারীর মধ্যে পণ্য বিক্রিতে সবচেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে রেকিট বেঙ্কিইজারের। দেশব্যাপী লকডাউনের সময়ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এ সময় নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৩ শতাংশ বেশি হয়। করোনার ঝুঁকি বিদ্যমান থাকায় তৃতীয় প্রান্তিকেও কোম্পানির পণ্য বিক্রিতে ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এ সময়েও রেকিট বেঙ্কিইজারের নিট মুনাফা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ধারাবাহিক প্রবিৃদ্ধিতে রয়েছে এফএমসিজি খাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড। লকডাউনের সময় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রিতে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রান্তিকে কোম্পানির নিট মুনাফা ১৭ শতাংশ বেড়েছে। আর লকডাউন-পরবর্তী সময়ে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পণ্য বিক্রি আরও বেড়েছে। এ সময়ে বিক্রি থেকে আয়ে প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। নিট মুনাফাও একই হারে বেড়েছে। নারিকেল তেলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে দেশে শীর্ষস্থানে থাকা ভারতীয় ম্যারিকো লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি ম্যারিকো বাংলাদেশ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২২৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
লকডাউনে সাধারণ মানুষ ইন্টারনেট ও কথা বলায় অনেক সময় ব্যয় করলেও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের টার্নওভার ৮ শতাংশ কমে যায়। এ সময় কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমে ২৩ শতাংশ। করোনা পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যার মধ্যে হারানো গ্রাহক ফিরে পেলেও তৃতীয় প্রান্তিকে মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারে গ্রাহকদের হিসেবি আচরণে আয় কিছুটা কমেছে গ্রামীণফোনের। তবে আয়কর বাবদ ব্যয় অনেকাংশে কমে যাওয়ার ফলে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা বেড়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কর পরিশোধের পরিমাণ কমেছে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা বেড়েছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ।
করোনায় এপ্রিল-জুন সময়ের ধাক্কা সামলে উঠেছে সিঙ্গার ও লিন্ডে বাংলাদেশ। লকডাউনের সময় সিঙ্গারের বিক্রি থেকে আয় ৪২ শতাংশ কমলেও জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ১৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। লকডাউনে পড়ে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কোম্পানির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কমলেও পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে এসেছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে সিঙ্গারের নিট মুনাফা বেড়েছে ৪ শতাংশ। আর লকডাউনের সময় লিন্ডে বাংলাদেশের নিট মুনাফা ৭৪ শতাংশ কমলেও জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে কোম্পানিটির।
দেশে করোনা সংক্রমণের পর এপ্রিল-সেপ্টেম্বর সময়ে তামাক উৎপাদনে শীর্ষ কোম্পানি বিএটি বাংলাদেশের সিগারেট বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় কমে যাওয়ায় নিট মুনাফার ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রেখেছে কোম্পানিটি। লকডাউনের সময় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিএটি বাংলাদেশের নিট মুনাফা বাড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ। আর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয় ২ শতাংশ।
এদিকে করোনার মধ্যে অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানি মুনাফা ধরে রাখতে সমর্থ হলেও সংকটে পড়েছে বাটা সু। লকডাউনের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল ফিতরে পণ্য বিক্রিতে বড় ধাক্কা খেয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পণ্য বিক্রি ৮৫ শতাংশ কমে যায়। পরে দেশে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হলেও পরবর্তী মৌসুমেও কাক্সিক্ষত পণ্য বিক্রি হয়নি। ফলে করোনার কারণে বাটা সু বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লোকসানে পড়েছে। ফলে এপ্রিল-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাটা ১২৫ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। লকডাউনের সময় যে লোকসান হয়েছে, তা পরবর্তী প্রান্তিকেও সামাল দিতে পারেনি আরএকে সিরামিক। আর সিমেন্ট খাতের অপর বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট কোম্পানি অবশ্য গত বছর থেকেই লোকসানে রয়েছে।