মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ৩৩টি প্রামাণ্য তালিকার নাম প্রকাশ করেছে সরকার। এগুলোর যেকোনো একটিতে নাম থাকলেই মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সন্তান বা পোষ্যরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরি থেকে অবসরোত্তর ছুটি, ব্যাংক ঋণ, চিকিৎসা সেবাসহ সরকারঘোষিত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মুখে সরকার মুক্তিযোদ্ধা সনদের প্রত্যয়নের দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ১৮ অক্টোবর এসব সিদ্ধান্তের পরিপত্র জারি করেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শহীদুল হক ভূঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা সনদ দিতে পারছি না। অনেক দিন ধরে সনদ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। কিন্তু অনেক কর্মকর্তার পিআরএল সামনে, শিক্ষার্থীদের ভর্তি আছে, আরও অনেকের অনেক ধরনের বিষয় রয়েছে। এসবের নিষ্পত্তি দরকার। আমাদের যে ৩৩টি প্রমাণ আছে সেটার ভিত্তিতে আপাতত কাজ চলবে। আগে তিন বা চার ক্যাটাগরিতে সনদ প্রত্যয়ন করা হতো। এখন প্রত্যয়ন করা হবে সাত ক্যাটাগরিতে। সাত ক্যাটাগরির ৩৩টি উপায়ে সনদ প্রত্যয়ন করা যাবে। এখন সনদ জাল করা যায়। এ কারণে ভেবেচিন্তেই সনদের প্রত্যয়ন দিতে হয়। সনদের সঙ্গে একটা স্মার্ট আইডি কার্ড দেওয়া হবে। এসবের কাজ চলছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কয়েকটি ক্যাটাগরিতে সনদ যাচাইয়ের কথা বলেছিল। বর্তমান প্রজ্ঞাপনে সে বিষয়টিকেই আরও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। এ প্রজ্ঞাপনটা যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে কারা সনদ পাবে।’
বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কত জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, ‘সংখ্যা নিরূপণের কাজ চলমান। অনলাইন পেমেন্টের জন্য আমরা ফিল্ড লেভেলকে গত মাস পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম। ৫০৬টি উপজেলার মধ্যে এখনো পর্যন্ত ২৫ শতাংশ উপজেলা থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। দেশে-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধে অনেকের অবদান রয়েছে। তারা অন্তর্ভুক্ত হবেন। একটা সময় ছিল প্রশাসনে কর্মকর্তারা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে ভয় পেতেন। কিন্তু সেদিন আর নেই। এসব কারণে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।’
২০১৭ সালে প্রমাণক হিসেবে লাল মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা ও গেজেটে প্রকাশিত নামকে প্রত্যয়নের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করে তালিকার নাম প্রকাশ করে সরকার। কিন্তু নতুন পরিপত্রে লাল মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা ও গেজেটসহ মোট সাত শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। মোট সাত ক্যাটাগরিতে ৩৩টি প্রমাণকে মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ের ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতীয় তালিকার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেক্টর) এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী)।
লাল মুক্তিবার্তার মধ্যে রয়েছে লাল মুক্তিবার্তা (চূড়ান্ত লাল বই), লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা। গেজেটের মধ্যে রয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বেসামরিক গেজেট, প্রবাসে বিশ^ জনমত গেজেট, বিসিএস ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গেজেট, বিসিএস গেজেট, স্বাধীন বাংলা বেতার শব্দ সৈনিক গেজেট, বীরাঙ্গনা গেজেট, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গেজেট, ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী গেজেট, বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়োজিত বা দায়িত্ব পালনকারী মুক্তিযোদ্ধা গেজেট এবং মুজিবনগর গেজেট।
বাহিনী গেজেটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেনাবাহিনী গেজেট, নৌবাহিনী গেজেট, বিমানবাহিনী গেজেট, বিজিবি গেজেট, পুলিশ বাহিনী গেজেট, আনসার বাহিনী গেজেট ও নৌ কমান্ডো গেজেট।
শহীদ গেজেটের মধ্যে রয়েছে শহীদ বেসামরিক গেজেট, সশস্ত্র বাহিনী শহীদ গেজেট, শহীদ বিজিবি গেজেট ও শহীদ পুলিশ গেজেট। খেতাবপ্রাপ্তদের নাম রয়েছে খেতাবপ্রাপ্ত গেজেটে। যুদ্ধাহতদের নাম রয়েছে যুদ্ধাহত গেজেট, যুদ্ধাহত পঙ্গু (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) গেজেট, যুদ্ধাহত (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) গেজেট এবং যুদ্ধাহত সেনা গেজেটে।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং গেজেট যাচাই করে মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সুবিধা প্রদানের কার্যকরী ব্যবস্থা নেবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুকূলে সাময়িক সনদ না দেওয়ায় তাদের যথার্থতা নির্ণয়ে সাময়িক সনদ বা বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ (বামুস) সনদ প্রযোজ্য হবে না। এসব প্রমাণক বা গেজেটের কোনো একটিতে মুক্তিযোদ্ধার নাম না থাকলে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কোনো সুবিধা দেওয়া যাবে না।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিরূপণ করতে পারেনি সরকার। বর্তমান সরকারও চেষ্টা করছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের জন্য। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দিচ্ছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রয়েছে কোটা। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে রয়েছে কোটা। চাকরিরত মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের সন্তানরা ৬০ বছর পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধারা নানাভাবে সম্মানিত হচ্ছেন। এসব সুবিধা লাভের জন্য একশ্রেণির ব্যক্তি সনদ জাল করে মুক্তিযোদ্ধা সাজার চেষ্টা করছেন। অনেক জায়গায় তাদের সনদ দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এসব সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই না করার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে সনদ বাতিল করার ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বদলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থা বা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রত্যয়নের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে জাল সনদ তৈরির বিষয়টি আরও বাড়বে কি না জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব মো. শহীদুল হক ভূঞা বলেন, ‘ভুয়া সনদ দিয়ে যেন কেউ সুবিধা নিতে না পারে সেজন্যই আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ৩৩টি প্রামাণ্যের তালিকা প্রস্তুত করেছি। যে মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, সেই সঙ্গে দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা বা বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন সনদ উপস্থাপন করবেন তখন তারা সংশ্লিষ্ট সনদটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেখে নেবেন। এতে বিষয়টি আরও সহজ হবে।’
মুক্তিযোদ্ধার তালিকার মতো রাজাকারের তালিকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ নিয়ে বিতর্কের জেরে তা স্থগিত রাখা হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধার সঠিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করবেন এমন ঘোষণা দিলেও সেটা এখনো হয়নি।
স্বাধীনতার পর ১৯৮২-৮৩ সাল পর্যন্ত দেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করা হয়নি। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও চেয়ারম্যান হন। অথচ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিধান অনুযায়ী কোনো অমুক্তিযোদ্ধার চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নেই।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর বিএনপি আমলে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এ মন্ত্রণালয় গতি পেলেও মূল কাজ নিয়ে তেমন এগোতে পারেনি।
জনপ্রশাসনের ছয় সচিব, শীর্ষ কর্মকর্তাসহ প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির ভুয়া সনদ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয় ২০১৪ সালে। এদের বেশিরভাগই সনদ নিয়েছিলেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই। সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের বিচার না করে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। কিন্তু গত ছয় বছরে কোনো মামলা হয়নি।