আইকাও মানদন্ড পূরণে হিমশিম বেবিচকের

তিন বছর আগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) পুরনো ৫২২টি পদ বিলুপ্ত করে নতুন ২ হাজার ৫০০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়েও প্রস্তাবিত ওই নতুন পদগুলোর নিয়োগ কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাবটি যেন হিমঘরে আটকে আছে। কবে তা আলোর মুখ দেখবে তা পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কেউ। এ নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় শুধু আশার বাণী শোনাচ্ছে বলে অভিযোগ বেবিচক কর্মকর্তাদের। এ পরিস্থিতিতে লোকবল সংকটে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) মানদন্ড পূরণে হিমশিম খাচ্ছে বেবিচক। যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রতিষ্ঠানটির সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বেবিচকের ৫২২টি পদ বিলুপ্তি করে দেয়। একই সঙ্গে তখন নতুন ২ হাজার ৫০০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর এ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বেবিচক কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক এবং তথ্যন্ডউপাত্ত সংগ্রহ করেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। দিনের পর দিন প্রস্তাবনার সেই ফাইল একই স্থানে ঝুলে আছে। সচিব কমিটিতে প্রস্তাবনার ফাইলটি ওঠার কথা থাকলেও তা উঠছে না। কোনো সুরাহাও হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে বেবিচকের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করলেও চাকরির ক্ষতি হওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন না কেউ। বেবিচকে ৩ হাজার ৭৫৩ জনবলের কাঠামো ছিল। এর মধ্যে ৫২২টি পদ বিলুপ্ত করার পর প্রস্তাবিত ২ হাজার ৫০০টি নতুন পদসহ নতুনন্ডপুরনো মিলিয়ে মোট জনবল হওয়ার কথা ৫ হাজার ৭৩১। বর্তমানে বেবিচকের তিনটি সদস্য (প্রশাসন, অপস ও অর্থের) পদের সঙ্গে যোগ হয়েছে সদস্য এফএসআর, সদস্য নিরাপত্তা ও সদস্য এটিএম।

বেবিচকের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যদি নতুন পদ তৈরি করতে এত বিড়ম্বনা তাহলে পুরনো পদগুলো বিলুপ্তি করার কী দরকার ছিল? ১৯৮৫ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি গঠনের পর থেকে ন্যূনতম জনবল দিয়ে কোনোরকমে কাজ চালানো হতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এ প্রতিষ্ঠানটির। আইকাও এর মানদন্ড অনুযায়ী দুনিয়াব্যাপী আকাশ চলাচল খাতে রেগুলেটর ও সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও বাংলাদেশে এখনো দুটি দায়িত্বই পালন করছে সিভিল এভিয়েশন। তার ওপর লোকবলের ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী চলতে বেবিচককে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ২০১১ সালে নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটা ছিল খুবই ধীরগতির। বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।

প্রস্তাবিত নতুন পদগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সাধারণ প্রশিক্ষণ), পরিচালক (সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা), উপপরিচালক (প্রশাসন), উপপরিচালক (সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা), উপপরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সাধারণ প্রশিক্ষণ, উপপরিচালক (আইন), সহকারী পরিচালক (প্রশাসন), সহকারী পরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সাধারণ প্রশিক্ষণ), সহকারী পরিচালক (সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা), সহকারী পরিচালক (শৃঙ্খলা), সহকারী পরিচালক (আইন), সিনিয়র অফিসার, মেডিকেল অফিসার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা, মোটর ট্রান্সপোর্ট কর্মকর্তা, গ্যাস টেকনেশিয়ান, পুরোহিত, ড্রাইভার (৬০টি), ইমাম, মুয়াজ্জিন, ফটোকপি অপারেটর, সার্ভেয়ার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, অফিস সহায়ক, নির্বাহী পরিচালক সেমসু, সহকারী ভান্ডার কর্মকর্তা, নির্বাহী পরিচালক (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর), পরিচালক (শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর), পরিচালক (ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর), পরিচালক (কক্সবাজার বিমানবন্দর), উপপরিচালক (এটিএমন্ডডিঅ্যান্ডপি), উপপরিচালক (বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক), উপপরিচালক (এটিএম), সহকারী পরিচালক (এয়ারস্পেস ডিজাইন) ও সহকারী পরিচালক (ইনভেস্টিগেশন)।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত পদের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে অর্থ, আইন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক হচ্ছে। জনবলের সংকট থাকায় আমাদের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি আধুনিক এভিয়েশন খাত গড়তে হলে পদ অবশ্যই বাড়াতে হবে।’

বেবিচকের এ কর্মকর্তা আরও জানান, নতুন পদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচালক দেওয়া হয়েছে এফএসআর শাখায়। এখানে পাঁচজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের সঙ্গে থাকবেন ১৫ জন উপপরিচালক। ওই শাখায় নতুন করে ১২২টি পদ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া দুটি করে পরিচালকের পদ তৈরি করা হয়েছে প্রশাসন, এভসেক ও সেমসু শাখায়। একজন করে পরিচালক থাকবেন ফায়ার ও অর্থ শাখায়। লিফট অপারেটর, প্লাম্বার সহকারী ও হেলপারের (ইএম) ১২৪টি পদ আউটসোর্সিং হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া মালি, ট্রলিম্যান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অফিস সহায়ক, বেলদার, টেলিফোন লাইনম্যান, বাবুর্চি, বেয়ারার, মেট ও সহকারী বাবুর্চি থাকবে।

বেবিচকের আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব নতুন পদ কবে সৃষ্টি হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। আদৌ হবে কি না তা নিয়েও আমরা সন্দিহান।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মুফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেবিচকের প্রস্তাবিত নতুন পদগুলো দ্রুত সৃষ্টি হলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বেবিচকের বিভিন্ন শাখায় কিছুটা লোকবল সংকট থাকলেও তেমন একটা সমস্যা হচ্ছে না। তারপরও আমরা চাচ্ছি নতুন পদগুলো দ্রুত চূড়ান্ত হোক।’

অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত পদগুলো পূরণ করা হলে মানদন্ড বেড়ে যাবে গোটা সিভিল এভিয়েশনের। নতুন পদগুলো সৃষ্টির জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে কাজগুলো সম্পন্ন হবে।’