মেহেরপুরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে সফলতা পেয়েছেন চাষিরা

দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি ও সংকটের মধ্যে মেহেরপুরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করে সফলতা পেয়েছেন চাষিরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারিন্ড৫ জাতের নতুন উদ্ভাবিত এ জাতের পেঁয়াজ চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে প্রতি বছর ১০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঘাটতি দূর করা সম্ভব। এ বছর মেহেরপুরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ১০১ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ হয়েছে।

মেহেরপুরের পেঁয়াজ মাঠ পরিদর্শনে এসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক্সপার্ট পুলের সদস্য কৃষি গবেষক মো. হামিদুর রহমান জানান, পেঁয়াজ এতদিন ছিল এক মৌসুমি ফসল। তাই একসঙ্গে পেঁয়াজ উৎপাদনের পর চাষি যেমন দাম পেতেন না, আবার বছরের অন্য সময় সেই পেঁয়াজের সংকটের কারণে বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে যেত। তখন মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে    দেখা দিত সংকট। বিদেশ থেকে পেঁয়াজ এনেও ঘাটতি পূরণ হতো না। পেঁয়াজ নিয়ে বিতর্ক প্রতি বছরের ঘটনা। কিন্তু মেহেরপুরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের সফল চাষ এ দেশে পেঁয়াজ নিয়ে সব দুশ্চিন্তা দূর করেছে। পেঁয়াজ এখন বারোমাসী ফসল।

কৃষকরা জানান, তারা পল্লী কর্মন্ডসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় মেহেরপুরে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ শুরু করেন দুই বছর আগে। এখন দেশের কৃষিতে গ্রীষ্মকালীন এই পেঁয়াজ চাষ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। চাষি গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি সদর উপজেলার ইছাখালী গ্রামে ৩০ বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন নতুন এই পেঁয়াজ চাষ করে লাভবান হয়েছেন। ৯০ থেকে ১১০ দিনে এই পেঁয়াজ বিঘায় ১২০ থেকে ১৫০ মণ উৎপাদন হয়। গ্রীষ্মকালীন এই পেঁয়াজ প্রতি বিঘায় চাষ করতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। কৃষক সামিনুর রহমান জানান, গাংনী উপজেলার কালীগাংনী মাঠে তিনি ১৭ বিঘা বারিন্ড৫ গ্রীষ্মকালীন নতুন পেঁয়াজের চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূল হওয়ায় এই পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকি কম। নভেম্বরন্ডডিসেম্বরে এই পেঁয়াজ উৎপাদন হবে। ফলে চাষিরা সারা বছর পেঁয়াজ চাষ ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে পেঁয়াজের ঘাটতি যেমন কমবে, তেমনি চাষিরাও সারা বছর ন্যায্য দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারবেন।

পেঁয়াজের এই সফলতা দেখতে সরেজমিনে গেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসানুজ্জামান কল্লোল, কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক্সপার্ট পুলের সদস্য হামিদুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষক ড. মো. মিয়ারুদ্দিন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিটের মহাপরিচালক ড. মো. নাজিরুল ইসলাম, পিকেএসএফের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক ড. আকন্দ মো. রফিকুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক পার্থ প্রতিম সাহা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শৈলেন্দ্র নাথ হালদার, বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ড. মো. হামিম রেজাসহ অনেকে। তারা গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষিদের নিয়ে মাঠদিবস ও কর্মশালা শুরু করেছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসানুজ্জামান কল্লোল জানান, মেহেরপুরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের এমন সফল চাষাবাদ দেখে তারা মুগ্ধ। এই চাষাবাদ দেশে বিদ্যমান পেঁয়াজ সংকট মোকাবিলায় বিরাট ভূমিকা রাখবে। গ্রীষ্মকালীন এই পেঁয়াজ চাষকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয় বিশেষ সভা করে কৃষকদের প্রণোদনাসহ করণীয় নির্ধারণ করে এই চাষের বিস্তার ঘটাতে কাজ শুরু করবে।

পিকেএসএফের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক ড. আকন্দ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবিত বারিন্ড৫ জাতের পেঁয়াজের বীজ ভ্যালু চেইন প্রকল্পের মাধ্যমে তারা মেহেরপুরে প্রথম গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ শুরু করেন, যা দেখে এখন সবাই মুগ্ধ। এখন এই পেঁয়াজ সংরক্ষণেও পিকেএসএফ চাষিদের সহায়তা দিচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় ২২৫০ জন কৃষককে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষবিষয়ক ও ৭৮০ জনকে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনবিষয়ক কারিগারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৭০টি পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন প্রদর্শনী ও শীতকালীন পেঁয়াজের পচন রোধে স্বল্প ব্যয়ে এমবিয়েন্ট কুলিং সিস্টেম প্রযুক্তির ১৩৭টি সংরক্ষণাগার প্রদর্শনী হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। এতে পেঁয়াজের ওজন কম হ্রাস পায়। ফলে মজুদে রেখে চাষিরা বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। দেশে বার্ষিক ২০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদার বিপরীতে শুধু শীতকালে ১৭ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়। বছরব্যাপী উৎপাদন করা গেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে পেঁয়াজ রপ্তানি করা সম্ভব।

বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ড. মো. হামিম রেজা জানান, ১০ বছর আগে তারা বারিন্ড৫ জাতের গ্রীষ্মকালীন নতুন এই পেঁয়াজের বীজ উদ্ভাবন করেন। কিন্তু কেউ ব্যবহার না করায় এই বীজ গবেষণাগারেই সংরক্ষণ ছিল। পিকেএসএফ প্রথম এই বীজ ব্যবহার করে চাষে সফলতা দেখাল। এখন এই বীজ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে তারা বেশি বেশি বীজ উৎপাদন করতে প্রস্তুতি শুরু করেছেন।