জনপ্রতিনিধির বাল্যবিয়ে

দেশ যখন বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে তখন স্থানীয় সরকারের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কেন আইন অমান্য করে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীকে বিয়ে করে বাল্যবিয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন? অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরই সমাজ থেকে বাল্যবিয়ে বন্ধের প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা। সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের যৌথ উদ্যোগে বাল্যবিয়ে বন্ধে ইতিবাচক নানা পদক্ষেপের কথা সংবাদমাধ্যমে প্রশংসিতও হয়েছে। কিন্তু কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তালেব সরকার তৈরি করলেন একটি ন্যক্কারজনক ও নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। ৪৫ বছর বয়সী এই ইউপি চেয়ারম্যান গত রবিবার সেখানকার বকশীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বিয়ে করেছেন।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘ইউপি চেয়ারম্যানের বাল্যবিয়ে!’ শিরোনামে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান নিজেই ফেইসবুকে বিয়ের ছবি প্রকাশের পর এ নিয়ে এলাকায় তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। স্থানীয়রা জানান, দোলন গ্রামের এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েটিকে নানাভাবে ফুসলিয়ে তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং হতদরিদ্র মেয়েটির পরিবারকে আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখাতে থাকেন। এরই একপর্যায়ে গত রবিবার রাতে মেয়েটির পরিবারের লোকজনের উপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এটি তার তৃতীয় বিয়ে। ওই চেয়ারম্যানের প্রথম স্ত্রী এবং কলেজপড়ুয়া একটি মেয়ে রয়েছে। এরপর তিনি আরেকটি বিয়ে করলেও সেটি বেশিদিন টেকেনি। এদিকে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে বাল্যবিয়ে করলেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বকশীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেছেন, এমন বাল্যবিয়ে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে উলিপুরের সহকারী কমিশনার, ভূমি ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যেহেতু বাল্যবিয়ে হয়ে গেছে, সেখানে মোবাইল কোর্ট করার সুযোগ নেই, তবে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেউ অভিযোগ করুক বা না করুক, এই ইউপি চেয়ারম্যান নাবালিকাকে বিয়ে করে স্পষ্টতই দেশের আইন লঙ্ঘন করেছেন। আগে দেশে বাল্যবিয়ে বন্ধের আইনটি ছিল ১৯২৯ সালের। সেটা রদ করে সরকার ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনু২০১৭’ পাস করেছে। কিন্তু এই আইনের ১৭ ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নাবালিকার বিয়ের একটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে নাবালিকার সর্বোচ্চ স্বার্থরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সর্বোচ্চ স্বার্থ কীসে রক্ষিত হবে সেটা অভিভাবকরা কীভাবে নির্ধারণ করবেন। বলাবাহুল্য দারিদ্র এ ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ নাবালিকার ভরণপোষণ ও লেখাপড়ার ব্যয় চালাতে অক্ষম পরিবারগুলো এই বিধানের সুযোগ নিয়ে বাল্যবিয়ের চেষ্টা চালাতে পারে। ফলে আইনের এই ধারাটির সমালোচনাও রয়েছে। উলিপুরের ঘটনায় আদালতের অনুমতি নেওয়ারও তোয়াক্কা করেননি ইউপি চেয়ারম্যান ও মেয়েটির পরিবারের সদস্যরা। সেক্ষেত্রে অবশ্যই এই চেয়ারম্যানকে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচারের আওতায় আনা উচিত হবে স্থানীয় প্রশাসনের।

করোনা মহামারীর মধ্যেই কদিন আগে জাতিংসঘ শিশু তহবিল ‘ইউনিসেফ’ বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এখনো দেশের অর্ধেকের বেশি মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায় ১৮তম জন্মদিন পেরুনোর আগেই। ইউনিসেফ একইসঙ্গে জানায় দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ে হয় বাংলাদেশে। এছাড়া বিশ্বে বাল্যবিয়ে সবচেয়ে বেশি এমন দশটি দেশের একটি বাংলাদেশ। ‘বাল্যবিয়ের সমাপ্তি : বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে দেশের নারীদের ৩ কোটি ৮০ লাখ শিশুকালেই কনে হতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ এখন ২০ু২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১ শতাংশেরই বিয়ে হয়েছে তাদের ১৮তম জন্মদিনের আগেই। আর দেশের নারীদের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখের বিয়ে হয় তাদের বয়স ১৫ বছর হওয়ার আগেই। তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার আগের তুলনায় কমে এখন ৫১ শতাংশে নেমে এসেছে।

বাল্যবিয়ের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের কিশোরী ও নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু, নারীর শিক্ষা, উপার্জনসহ নারীর সামগ্রিক সামাজিক সক্ষমতা। একইসঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও বাল্যবিয়ে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাজে বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা দরকার। এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের সাফল্যগুলোও প্রচারে আনা জরুরি। এখন কোথাও বাল্যবিয়ের অপচেষ্টা করা হলে জাতীয় হেল্পলাইনে ৯৯৯ নম্বর কিংবা ১০৯ নম্বরে বিনামূল্যে ফোন করে সেটা থামানোর জন্য পুলিশের সহায়তা নেওয়া যায়। মেয়ে শিশুর সোনালি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কেড়ে নেওয়া বাল্যবিয়ের এই ব্যাধি থেকে সমাজের মুক্তি প্রয়োজন।