আইনে ক্ষমতা থাকলেও প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কক্সবাজার ও এর সন্নিহিত এলাকার সমন্বয়ে একটি আধুনিক ও বিশ্বমানের পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ গঠন করা হয় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (কউক)। এ সংক্রান্ত আইনে প্রতিষ্ঠানটিকে যেসব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তার বেশিরভাগেই তারা হাত দিতে পারেনি। স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা আর প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে যেন ‘ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার’-এ পরিণত হয়েছে কউক। একই সঙ্গে আর্থিক ও জনবল সংকটও প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে কউক কর্র্তৃপক্ষ বলছে, বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা পুরো কক্সবাজার ঘিরে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন নগরী কক্সবাজার।

কউক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত পর্যটন নগরী বাস্তবায়ন, সৌন্দর্য বর্ধন, যানজট নিরসন ও আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য কউক গ্রহণ করেছে একগুচ্ছ প্রকল্প। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি কউকের ৬৯০.৬৭ বর্গকিলোমিটার অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এ অধিক্ষেত্রের ওপর মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলার মহাপরিকল্পনা শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যা বর্তমানে একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কউক চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন হিসেবে কক্সবাজারকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এটি বাস্তবায়নে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানসহ মাস্টার প্ল্যান খুবই জরুরি। তাই আধুনিক কক্সবাজার গড়ে তোলার জন্য এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদিত হলে মাঠপর্যায়ে স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে যুগোপযোগীভাবে উক্ত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও নতুন নকশা অনুমোদনে কউক বেশ জোরালোভাবে কাজ করছে। কাক্সিক্ষত সহযোগিতা পেলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা একটি ভালো ফলাফল উপহার দিতে পারব।’

কউক কর্মকর্তারা জানায়, কক্সবাজারের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য হাজার বছরের ঐতিহ্য লালদীঘি, গোলদীঘি ও বাজারঘাটা পুকুরগুলোর সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এখানে পাড় বাঁধানো, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বসার স্থান, আলোকসজ্জা, সবুজ বেষ্টনী, স্ন্যাকস বারসহ পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে পর্যটকসহ স্থানীয় জনসাধারণের বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য শহরের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৪টি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের ছাত্রদের গণআন্দোলন, ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন নিয়ে টেরাকোটা।

কউক কর্মকর্তারা আরও জানান, কক্সবাজারের যানজট নিরসনের জন্য বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হলিডে মোড়-বাজারঘাটা-লারপাড়া (বাস টার্মিনাল) সড়ক সংস্কারসহ প্রশস্তকরণ। প্রকল্পটি ইতিমধ্যে একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এতে ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, সাইকেলওয়ে, সবুজায়ন, ফুটওভার ব্রিজ, সড়কে বিদ্যুতায়ন, ফুটপাত নির্মাণ, সোসার ড্রেন, সিসি ক্যামেরা, ওয়াইফাই সংযোগসহ নানা উন্নয়ন কাজ রয়েছে। তাছাড়া বাঁকখালী নদীসংলগ্ন ১৫০ ফুট প্রশস্ত সবুজ বেষ্টনী সহকারে বিকল্প সড়ক উন্নয়ন, কালুর দোকান হতে লাইট হাউজ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজার এলাকায় ইমারত নির্মাণের জন্য এতদিন বিশেষায়িত কোনো সংস্থা ছিল না। ফলে সেখানে অনেকটাই অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে কউক গঠনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। এ কমিটি আওতাধীন এলাকার ভবন নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন, পাহাড় কাটা, সমুদ্রসৈকতের পাশে আবাসিক, বাণিজ্যিক হোটেল/ভবন অথবা পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আইনে থাকা বাংলাদেশ পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা বা বিশেষ পর্যটন অঞ্চল নিয়েও এ কমিটি কাজ করছে।

তবে সংস্থাটির বোর্ড সভায় নির্ধারিত সব কর্মকর্তারা উপস্থিত হন না। এ পর্যন্ত মোট ১৩টি বোর্ড সভার একটিতেও জেলার পুলিশ সুপার উপস্থিত হয়নি। আবার বিভিন্ন কার্যক্রমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ জেলা পর্যায়ে শীর্ষ কর্মকর্তারা সমন্বয়ে খুব একটা সহযোগিতা করেন না বলে জানা যায়। এছাড়া আইনে পর্যটন সম্পর্কিত যেসব কাজ কউককে করতে বলা হয়েছে এর বেশির ভাগই অন্য সংস্থার সংশ্লিষ্টরা আমলে নিচ্ছে না। ফলে গত কয়েক বছর আগে গঠন হওয়া সংস্থাটি কাজের ক্ষেত্রেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। সংস্থাটির মোট ২৪০ জন জনবলের মধ্যে মাত্র ২০ জন রয়েছে। বিশাল কাজের বিপরীতে এত কম জনবল দিয়ে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও খুব বেশি এগোতে পারছে না কউক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কক্সবাজার ঘিরে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নানা উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, সৌন্দর্যবর্ধনের কাজসহ বিচ দখল ঠেকাতে কিছু পদক্ষেপ রয়েছে। পুরো কক্সবাজার ঘিরে আমাদের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এটির মাধ্যমে আমরা পরিকল্পিত একটি পর্যটন নগরীর রূপ দিতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘কউক তাদের কম জনবল নিয়েও অনেক ভালো কাজ করেছে। আমরা তাদের জনবল বাড়ানোর জন্য সব মন্ত্রণালয় থেকে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করেছি। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে কউক আরও অনেক জনবল পাবে। আমরা আশা করব নতুন কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্থানীয় জেলা প্রশাসনসহ সব ধরনের সংস্থা কউককে সহযোগিতা করবে।’