সবার বোঝার জন্য আদালতের রায় ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য প্রয়োজনে অনুবাদক (ট্রান্সলেটর) নিয়োগদানের জন্যও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বিচারাধীন মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণে বিচারক ও আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান।
গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর জনসন রোডে আদালতপাড়ায় ঢাকা জেলার নবনির্মিত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এ নির্দেশনা দেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।
আইন সচিব গোলাম সারোয়ার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মূল অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থেকে ভবনের ফলক উন্মোচন করেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকা জেলার নবনির্মিত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের একটি রেপ্লিকাও উপহার দেন। এ সময় করোনাভাইরাসে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ দেশ-বিদেশে যারা মারা গেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে মামলার রায়গুলো ইংরেজিতে দেওয়া হয়। অনেকে সেই রায়টা বুঝতে না পারায় আইনজীবীরা যেভাবে বোঝান সেভাবে তাদের বুঝতে বা জানতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজিতে লিখতে লিখতে অনেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তাই বাংলাতেই রায় লিখতে হবে, এ ধরনের চাপ প্রয়োগ ঠিক নাও হতে পারে। ইংরেজিতে লেখেন কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সেই রায়টা বাংলায় ট্রান্সলেশন করে যেন প্রচার হয় সে ব্যবস্থাটা করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে যদি কোনো ফান্ড লাগে সেটারও ব্যবস্থা করব। কিন্তু আমি চাই এটা যেন হয়। ফলে বিচারের কী রায় হলো তারা সেটা নিজে দেখে বুঝতে পারবে, জানতে পারবে। প্রধান বিচারপতিকেও আমি অনুরোধ করব, আইনমন্ত্রীও এখানে আছেন, আপনারা কিছু ব্যবস্থা নেন। কারণ এটা জুডিশিয়াল ব্যাপার, এর অনেক কথা, শব্দ, টার্মস যেগুলো আমাদের সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় না সেগুলোর অনুবাদ যদি সহজভাবে করা যায়।
ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিরসন প্রয়োজন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, জুন ২০২০ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে ৩৭ লাখ ৯৪ হাজার ৯০৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই এত মামলা এভাবে জমে যেন না থাকে, কীভাবে এসব মামলার বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায় অবশ্যই এ ব্যাপারে একটু আন্তরিক হবেন এবং ব্যবস্থা নেবেন। এজন্য যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতেও সরকার প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু এতগুলো মামলা এভাবে পড়ে থাকুক সেটা আমরা চাই না। বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও এজলাস সংকট নিরসনের পাশাপাশি মামলা ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে অধঃস্তন আদালতে ১ হাজার ১২৬ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিচার বিভাগের উন্নয়নে তার সরকারের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৪২টি জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য ৮-১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৯টি জেলায় নবনির্মিত আদালত ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। এসব ভবনে স্থাপিত আদালতে এখন উন্নত পরিবেশে বিচারিক কাজ চলছে। অবশিষ্ট জেলাগুলোতেও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আজ (গতকাল) ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের উদ্বোধন করা হলো। আমার প্রত্যাশা, এ ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে জনগণের বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে। এছাড়া দরিদ্র-অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সরকারিভাবে আইনি সহায়তা প্রদান করার লক্ষ্যে দেশের ৬৪টি জেলা সদরে এবং সুপ্রিম কোর্টে লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে জুলাই ২০২০ পর্যন্ত জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে সর্বমোট ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩০ জনকে বিনামূল্যে আইনি সেবা প্রদান করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সাতটি সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন, সাতটি বিভাগীয় শহরে সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের পর ২০২০ সালে আরও ছয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া সাতটি মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ধর্ষণের মামলায় ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে তার সরকার ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০’ প্রণয়ন করেছে এবং মাদকসংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার প্রদান অব্যাহত রাখতে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য ‘আদালত কর্র্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার, আইন ২০২০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের কারাগারে এ ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দাগি আসামিদের বিচারের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে দেশের সব কারাগারেই ভার্চুয়াল কোর্টের ব্যবস্থা রাখতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
যতদিন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন না আবিষ্কার হবে বা সহজলভ্য হবে সে পর্যন্ত এর সুরক্ষা অত্যন্ত কঠিন আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং বাইরে বের হলে বা কর্মক্ষেত্রে গেলে মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, ‘এই করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে এবং অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।’