মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সাধারণ আমেরিকানদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষায় আছে। রাশিয়া ও চীন এখনো এ নির্বাচন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি। তারা বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার উল্লেখ করে এড়িয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও প্রকারান্তরে ট্রাম্পের পক্ষেই কথা বলেছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নেতারা ও জার্মানি সবাইকে বর্তমান পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে নির্বাচনী ফলের জন্য অপেক্ষা করতে আহ্বান জানিয়েছে। ইরান অনুমিতভাবেই ট্রাম্পকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছে তবে তার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন ফ্রান্স ও ইতালির ডানপন্থি নেতারা।
গত বুধবার সকালে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য কনস্টান্টিন কোসাচেভের মাধ্যমে জানিয়েছেন, এবারের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ এড়াতে ক্রেমলিন তৎপর।
কোসাচেভ বলেন, ‘আমেরিকার এখন নিজেদের রাজনীতিতে ফিরে আসার সময় এসেছে।’ রাশিয়ার প্রধান বিরোধী নেতা আলেক্সি নাভালনি টুইট করে বলেছেন, ‘আমি জেগে উঠে কে জিতেছে তা জানতে টুইটারে গিয়েছিলাম। এখনো কিছুই পরিষ্কার নয়, সুতরাং এটি একটি আসল নির্বাচন।’
বাণিজ্য, কারিগরি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয়ে সংঘর্ষের জের ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। গত বুধবার চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেছেন, ‘আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং চীনের এ বিষয়ে কোনো অবস্থান নেই।’
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের প্রধান সম্পাদক হু জিজিন মন্তব্য করেছেন, মতামত জরিপগুলোকে চীনা নেটিজেনরা উপহাস করছে। চীনে অবস্থানরত শীর্ষস্থানীয় এক মার্কিন কূটনীতিক বলেছেন, ‘চীনা কর্মকর্তারা আমার কাছে অভিযোগ করছেন যে লাঞ্চের মাধ্যমে আমাদের কোনো ফল হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, এটি গণতন্ত্র, এটি কিছুটা সময় নেয়।’
ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। গত জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতা কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার পর সম্পর্কের আরও অবনতি হয়। গত মঙ্গলবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিই একটি টুইটবার্তায় বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল দেশটির প্রতি আমাদের নীতিকে প্রভাবিত করবে না। তবে আলি খামেনি মঙ্গলবার আরেক বক্তৃতায় বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে মারাত্মক নাগরিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক পতন ঘটার প্রমাণ আছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাবিদরা স্বীকার করেছেন।’ খামেনি সাংবাদিক বব উডওয়ার্ডের বই ‘ফিয়ার : ট্রাম্প ইন দ্য হোয়াইট হাউজের’ প্রচ্ছদটিও শেয়ার করেছেন প্রমাণ হিসেবে।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বুধবার সকালে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিরোধীদলীয় নেতার দ্বারা ট্রাম্পের মন্তব্যে নিন্দা করার জন্য চাপ দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের বন্ধুবান্ধব ও মিত্রদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করি না।’
বুধবার ভোরে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ থেকে মিথ্যাভাবে জয় দাবি করার পরে একটি সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ডমিনিক র্যাবও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণা সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের রাতে উভয়পক্ষের মন্তব্য যাই হোক না কেন, আমি আত্মবিশ্বাসী মার্কিন সিস্টেমের ভারসাম্য একটি চূড়ান্ত ফলাফল এনে দেবে।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, কানাডা আমেরিকান জনগণ এবং আমেরিকান সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে সব কানাডিয়ান রাজনীতিবিদ ট্রুডোর সঙ্গে একমত নন। মঙ্গলবার কানাডার নিউ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা জগমিত সিং বলেছেন, ‘ট্রাম্প আমাদের সবার জন্য বিশ্বকে আরও বিপজ্জনক স্থান হিসেবে পরিণত করেছেন।’
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যানগ্রেট ক্র্যাম্প-ক্যারেনবাউর একটি সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অনিশ্চয়তাকে ‘অত্যন্ত বিস্ফোরক পরিস্থিতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জার্মান টেলিভিশন চ্যানেল জেডডিএফকে বলেছেন, ‘ফলাফল যাই হোক না কেন, ফলাফলের বৈধতার জন্য লড়াই শুরু হয়েছে। এটি একটি খুব বিস্ফোরক পরিস্থিতি, এমন একটি পরিস্থিতি যে এটি যুক্তরাষ্ট্রে সাংবিধানিক সংকট ডেকে আনতে পারে। এটা অবশ্যই সামগ্রিকভাবে আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা ধৈর্য রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার ইইউর এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা অপেক্ষা করছি যে ভোটের গণনার দায়িত্বে থাকা কর্র্তৃপক্ষ ফলাফল ঘোষণা করুন। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো ঘোষণা আসবে আমরা তা মেনে চলব এবং আমরা মনে করি প্রত্যেকেরও তা করা উচিত।’
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ইউরোপীয় পিপলস পার্টির নেতা ম্যানফ্রেড ওয়েবার একটি টুইট বার্তায় বলেছেন, ‘আমেরিকার গভীর মেরুকরণ হওয়া উচিত। ইউরোপের জন্য এটা একটি সতর্কতা। আমরা সফল কারণ আমরা দেশ ও জনগণের মধ্যে পার্থক্য সরিয়ে নিয়েছি। আমরা যদি আপস করার ক্ষমতা হারাই তবে আমাদের গণতন্ত্র বিপদে পড়বে।’
অন্যদিকে ট্রাম্পের জয়ের দাবিকে প্রশংসিত করেছে ইউরোপের ডানপন্থি নেতারা। ইতালির লিগ পার্টির নেতা মাত্তিও সালভিনি লিখেছেন, ‘সব সংবাদপত্রে বাইডেনের পক্ষে দুর্দান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যথারীতি এটি সঠিক হয়নি।’
ফ্রান্সের ডানপন্থি দল জাতীয় র্যালির নেতা (আগে জাতীয় ফ্রন্ট হিসেবে পরিচিত) মেরিন লে পেন বলেছেন, ‘ট্রাম্পের জয় ফ্রান্সের পক্ষে সেরা হবে।’ একটি ফরাসি টেলিভিশনে তিনি আরও বলেন, ‘অনেক আমেরিকান এখনো তাকে সমর্থন করে এবং কেউ কেউ আরও বেশি সমর্থন করে। আমি মনে করি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্মাণই ফ্রান্সের পক্ষে সবচেয়ে ভালো। কারণ ট্রাম্প হলেন জাতির প্রত্যাবর্তন।’
টাইম পত্রিকা থেকে অনূদিত