করোনার প্রথম অভিঘাতের শিক্ষা

একটা প্রবাদ আছে। ছাত্র জিজ্ঞেস করছে শিক্ষকের কাছে, শিখব কোথায়? জীবনের শিক্ষায় অভিজ্ঞ শিক্ষক উত্তরে বলেছিলেন, ঠেকবি যেথায়। অর্থাৎ প্রতিকূলতার কাছে হার মেনে নেওয়া নয়, প্রতিকূলতাকে জয় করে মানবজাতি এগিয়েছে। প্রকৃতির নবীন প্রজাতি হিসেবে মানুষের দক্ষতা এখানেই যে, সে শুধু প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বা মানিয়ে নিয়ে চলেনি, পরিবর্তনের পথেও চলেছে। প্রতিকূলতার কারণ খুঁজেছে, প্রতিকারের পথ রচনা করেছে। ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়নি। এমনকি মৃত্যুও তাকে থামাতে পারেনি; বরং একজনের মৃত্যুতে অনেকে সতর্ক হয়েছে, সাহসী হয়েছে, শত্রুকে চিনতে শিখেছে এবং বিজয়ী হওয়ার পথ রচনা করেছে। এই পথ পরিক্রমায় মানুষ মরেছে কিন্তু মানবজাতি এগিয়েছে ক্রমাগত। মানুষ এভাবেই শিখেছে এবং শিখিয়েছে পরবর্তী প্রজন্মকে। যেকোনো আঘাত বা ধাক্কায় প্রথমে থমকে দাঁড়ালেও পালিয়ে যায়নি। ভেবেছে এর কারণ কী? খুঁজে বের করেছে সমাধানের পথ। এটাই মানবজাতির ইতিহাস ও অগ্রগতির পথ; যা তাকে নিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের দিকে।

ইউরোপে শীত এসেছে। বাংলাদেশের মানুষ ধারণা করতে পারবে না ইউরোপের শীতের তীব্রতা কেমন? বসন্তে ইউরোপের জনগণের এত উচ্ছল হয়ে ওঠার বড় কারণ এই প্রচণ্ড শীত থেকে পরিত্রাণ। কিন্তু এবার তারা শীতের চেয়েও বেশি কাঁপছে করোনার দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের আতঙ্কে। ইতিমধ্যে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের দেশে দেশে। জীবন বাঁচাবে না জীবিকা রক্ষা করবে, কাজ না করলে জীবন বাঁচবে কীভাবে? অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাবে কোথায় আর তার খরচ আসবে কীভাবে? আর কত দিন সুরক্ষিত থাকার নামে বন্দি থাকতে হবে? এসব প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে কোটি কোটি ইউরোপবাসীকে। অনিশ্চয়তা আর একাকিত্বের কারণে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই। অর্থনীতির আয়তন বৃদ্ধি, সম্পদ বৃদ্ধি আর মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা বৃদ্ধি যে এক নয়, সে কথা এখন আর ব্যাখ্যা করে বলতে হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি আর জীবনমান যে হাত ধরে একইভাবে এগিয়ে চলে না, এটা এখন আর একাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়, ২০২০ সাল বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তা বুঝিয়ে দিল। বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরের কিউবা, কিছু দূরের ভিয়েতনাম আর পাশের নেপাল করোনা মোকাবিলার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে; যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্ববাসীর জন্যও বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

করোনার আগেও মহামারী বা অতিমারি হতবিহ্বল করেছে মানুষকে। মরেছে মানুষ, উজাড় হয়েছে জনপদ, সাময়িক বিপর্যয় এসেছে মানুষের জীবনযাত্রায়। এসব থেকে শিক্ষা নিয়েছে মানুষ এবং মোকাবিলা করেছে পরবর্তী আঘাত। মানবজাতির দশ হাজার বছরের লিখিত ইতিহাস আর ছবিতে, শিলালিপিতে বর্ণিত ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয়। ১০০ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লুতে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু এর সবচেয়ে নিকটতম উদাহরণ। বৃহদাকার শিল্প, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত বাজার, উৎপাদন ও বিপণনের আধুনিক উপায়সমূহ রাষ্ট্রের সীমানা সত্ত্বেও সারা বিশ্বের মানুষকে কাছাকাছি এনে দিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি একদিকে যেমন লুণ্ঠন বাড়িয়েছে, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দ্রুতগতিতে করোনা মহামারী ছড়িয়েছে দেশ থেকে দেশে। ফলে অভিজ্ঞতার বিনিময় করে মানুষ যেমন সচেতন হয়েছে, নিজেকে রক্ষা করতে শিখেছে আর পাশাপাশি চিহ্নিত করতে পেরেছে নিজেদের দুর্বলতাগুলো। রাষ্ট্র কত কর আদায় করবে আর কোথায় ব্যয় করবে, জনগণের বিপদে রাষ্ট্রের দায় কতখানি আর দায়িত্ব কতটুকু তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে বিশ্বব্যাপী। সম্প্রতি আমেরিকার নির্বাচনেও এই প্রসঙ্গ খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। করোনার প্রথম ধাক্কা বাংলাদেশ কীভাবে সামাল দিল এবং এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী ধাক্কা কীভাবে সামলাবে তা এখন আলোচনার বিষয়। করোনা মোকাবিলায় সরকার গৃহীত পদক্ষেপ এবং তার প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের উচ্চকণ্ঠ সাফল্য বর্ণনা আর বাস্তবতার ফারাকটাও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। এখন প্রশ্ন, করোনার প্রথম ধাক্কা থেকে কী শিক্ষা নিলাম বা পেলাম?

করোনার অর্থনৈতিক আঘাত নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ দেখিয়েছে যে করোনার স্বাস্থ্যঝুঁকির চেয়ে অর্থনৈতিক আঘাত কোনো অংশে কম নয়। মার্চ মাসে করোনা প্রথম শনাক্ত হওয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি বা কাজের উপযুক্ত জনসংখ্যার পরিমাণ ৬ কোটি ৩৬ লাখ। করোনার আগেও বেকারত্ব একটি প্রধান সমস্যা ছিল। প্রতি বছর গড়ে ২২ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রম বাজারে আসে। এর খুব কম পরিমাণ সরকারি উদ্যোগ বা ব্যবস্থাপনায় কাজে নিয়োজিত হয়। বিশাল অংশ বেসরকারি খাতে, স্ব-কর্মসংস্থান ও প্রবাসে কাজ খুঁজে নিত। করোনা তিন জায়গাতেই সংকট সৃষ্টি করেছে। সিটিজেন প্ল্যাটফরম ফর এসডিজি জুন মাসে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ অর্থাৎ মোট কর্মশক্তির ২০ শতাংশ শ্রমজীবী কাজ হারানোর ঝুঁকির মধ্যে আছে। সিপিডি অনুমান করেছিল দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০১৬ সালে যা ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ তা বেড়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হবে। ফলে নতুন করে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হবে। এপ্রিল মাসে পিপিআরসি এবং বিআইজিডি এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল গ্রামে ৫৪ ও শহরে ৭২ শতাংশ দরিদ্র বস্তিবাসী অর্থনৈতিকভাবে আয় হারিয়েছে। আইএফসি এক জরিপে দেখায়, ৭০ শতাংশ মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবীর কাজ ঝুঁকিপূর্ণ; কারণ এসব প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংক জরিপ করে দেখিয়েছে যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৬৮ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারিয়েছে। শ্রম গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিলস দেখিয়েছে, পোশাক খাতে ৩ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে পরিবারপ্রতি গড় আয় ২০ দশমিক ২ শতাংশ কমে গেছে।

করোনার অর্থনৈতিক আঘাত মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত পদক্ষেপ নিয়েও কিছু তুলনামূলক আলোচনা আছে। ১ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু তার প্রভাব বা সুফল কতটুকু এসেছে, এ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। প্রণোদনায় বরাদ্দ জিডিপির অনুপাতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ার ৩১টি দেশের মধ্যে ২২তম এবং মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়ায় ৭৫ ডলার। এই পরিমাণ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের চেয়ে অনেক কম। এই অঞ্চলে একমাত্র শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ বাংলাদেশের পেছনে আছে। মাথাপিছু বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের পেছনে আছে। অথচ ১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক কাজ করেছে বলে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। প্রশংসার সঙ্গে সহায়তার সম্পর্ক তেমন নেই কেন, এ বিষয়টি ভাবনার দাবি রাখে।

করোনায় বাংলাদেশের শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থান ও দেশের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কৃষি খাত। কিন্তু বাংলাদেশে চাষা শব্দটি যেমন তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়, কৃষি খাত ও কৃষক তেমনি উপেক্ষিত থাকেন সব সময়। করোনায় তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রায় ৩ কোটি কৃষকের জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে কম বরাদ্দ ৫ হাজার কোটি টাকা আর কৃষকদের প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুদহার এ বিষয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আমন মৌসুম শুরু হয়েছে। ধান ক্রয়নীতি ও লক্ষ্যমাত্রা ঘোষিত হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দাম ২৬ টাকা কেজিতে ২ লাখ টন ধান আর ৩৭ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ টন চাল কিনবে। প্রায় ১ কোটি টন ধান উৎপাদনের তুলনায় সরকারি সংগ্রহ কত কম তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কৃষক বাঁচায় দেশবাসীকে অথচ তারা উপেক্ষিত থেকেছেন সব সময়। বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ করোনাকালেও তার ব্যতিক্রম হলো না।

করোনায় স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা ও দুর্নীতি ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের আয় কমেছে। প্রবাসী শ্রমিকদের সংকট বেড়েছে তা সত্ত্বেও তারা দেশে টাকা পাঠাতে কার্পণ্য করেননি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু যারা কাজ হারিয়ে ফিরে আসছেন অথবা যারা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আবার যেতে পারছেন না, তাদের দুর্দশা আর দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ব্র্যাক পরিচালিত জরিপ বলেছে, ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, করোনা মহামারী চলাকালে এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ৪১২ জন। করোনার ধাক্কা তাহলে সবার গায়ে একরকমভাবে লাগেনি। অল্প কিছু মানুষ উপভোগ করেছে আর বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। দেশে অর্থনৈতিক দুর্নীতি, লুটপাট যে কমেনি তা বোঝা যায় এই দুর্যোগেও ধনীর সংখ্যাবৃদ্ধি দেখে। করোনার প্রথম ধাক্কা সাধারণ মানুষের দুর্দশা ও বৈষম্য বৃদ্ধির যে চিত্র আমাদের দেখাল, দ্বিতীয় ধাক্কাতেও কি তাই দেখবে দেশের মানুষ?

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com