ফল জানা গেলেও থাকছে চূড়ান্ত মীমাংসা নিয়ে অনিশ্চয়তা

নির্বাচনী লড়াই শেষ হলেও ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ স্টেটগুলোতে যুদ্ধ থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা, নেভাডায় ভোট গণনা শেষ হয়নি ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের পক্ষে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ২৫৩ আসন নিয়ে এগিয়ে আছেন। (অ্যারিজোনাকে অন্তর্ভুক্ত করলে ২৬৪। সিএনএন এবং অন্যান্য নেটওয়ার্ক অ্যারিজোনার ১১টি ভোট বাইডেনের পক্ষে গণনায় ধরেনি, এপি ধরেছে। বস্তুত অ্যারিজোনায় এখনো গণনা চলছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাইডেনের পাওয়া ভোটসংখ্যা কিছুটা কমেছে।)

অনেকের প্রশ্ন, এই চারটি অঙ্গরাজ্যে ভোট গণনায় এত সময় লাগছে কেন? কারণ হচ্ছে প্যানডেমিক। এর কারণে এবার বেশিরভাগ ভোটার, প্রায় ছয় কোটি, ডাকযোগে ভোট দেন। আগে কখনো এত বেশিসংখ্যক ভোট ডাকযোগে পড়েনি। আগের নির্বাচনগুলোতে এই সংখ্যা এত কম থাকত যে, ওই ভোটগুলো গণনার আগেই ফলাফল ঘোষণা করে দেওয়া যেত। এবারে ডাকযোগে যারা ভোট দিয়েছেন তাদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা রিপাবলিকান ভোটারদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। যেহেতু এই ভোটগুলোকে শেষের দিকে গোনা হচ্ছে, বাইডেনও এগিয়ে যাচ্ছেন ভোট গণনার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে।

আবার একেক অঙ্গরাজ্যে আইনকানুন একেক রকমের। যেমন ফ্লোরিডা ডাকযোগে পাওয়া ভোট পাওয়ার পরপরই গুনে ফেলতে পারে। অনেকগুলো যেমন পেনসিলভানিয়ায় আইন হচ্ছে এই ভোটগুলোকে সশরীরে পাওয়া সব ভোট গণনার পরে গুনতে হবে। এবারে ডাকযোগে ভোটের সংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে পেনসিলভানিয়ার আইনপ্রণেতারা আইন পরিবর্তন করে আগেই গোনার প্রস্তাব বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির আপত্তির কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। আপত্তির কারণ পরে বোঝা গেল ট্রাম্প যখন ভোটের দিনই সব গণনা শেষ করার দাবি জানালেন। এই দাবি করে তিনি কোর্টে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টায় আছেন। বলা বাহুল্য, সে দাবি মানা হয়নি এবং ট্রাম্প ক্যাম্পেইন ইতিমধ্যে আইনি লড়াই শুরু করে দিয়েছেন। মামলা দায়ের করেছেন। তার ব্যক্তিগত আইনজীবীকে পাঠিয়েছেন পেনসিলভানিয়ায়। ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টে তার মনোনীত তিনজন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে পেরেছেন। প্রয়োজনে কোর্ট তার পক্ষে রায় দেবে এমন আশা ট্রাম্পের মতো নীতিবিবর্জিত ব্যক্তির পক্ষে করা খুবই সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে কোর্ট কী করবে এখনই বলা কঠিন।

বাইডেনের জয়ের পথ বেশ কয়েকটা। শুধু পেনসিলভানিয়ার ২০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেলেই তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। অ্যারিজোনার ১১টি এবং নেভাডার ৬টি পেলে তিনি পান কাঁটায় কাঁটায় ২৭০টি, কমপক্ষে যা দরকার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য। শুধু জর্জিয়ার ১৬টি ভোট পেলে একটা অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বাইডেন এবং ট্রাম্প উভয়ের ভোটসংখ্যা হবে ২৬৯। এই পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তার বিধান যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, সেই পরিস্থিতিতে নবনির্বাচিত হাউজ বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। বাইডেন এখনো পর্যন্ত অমীমাংসিত চারটি স্টেটের সবগুলোতে জিতলে পাবেন ৩০৬টি, যা ২০১৬-তে ট্রাম্পের পাওয়া ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের সমান। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল জানার জন্য হয়তো বিশ্ববাসীকে আরও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। ফলাফল জানা গেলেও চূড়ান্ত মীমাংসা কীভাবে হবে এই অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

তবে এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে

এক. মতামত জরিপের ভিত্তিতে পূর্বানুমান মোটাদাগে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যাচ্ছে জরিপের ফল থেকে তা মোটামুটি জানা গেলেও ভোটের ব্যবধান অনুমানের চাইতে অনেক বেশি সংকীর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। কে কত শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জিতবেন বা হারবেন এই অনুমান অনেক ক্ষেত্রেই ভুল ছিল, দেখা গেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে জোয়ার আসছে এমন একটা ধারণা জরিপগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছিল। বাস্তবে তা দেখা যায়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবাক করা ঘটনা ঘটেছে। যেমন ফ্লোরিডায় বাইডেন ৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন, দেখা গেল ট্রাম্প ৩ পয়েন্ট বেশি নিয়ে জয়লাভ করলেন। তবে ফলাফল একেবারে অপ্রত্যাশিত হয়েছে, তাও বলা যায় না। যে তিনটি অঙ্গরাজ্য উইসকনসিন, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া আলোচনায় থাকবে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল সেগুলোই প্রত্যাশিত নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। এই তিনটিকে নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির যে কথিত ‘ব্লু ওয়াল’ ট্রাম্প গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন ২০১৬-তে, বাইডেন সে দেয়ালের ভিত আবার তৈরি করতে পেরেছেন মনে হচ্ছে।

দুই. ‘সানবেল্ট’খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে অবস্থিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির পায়ের তলা থেকে মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। এটি এবারের নির্বাচনে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। মূলত ল্যাটিন বা হিস্প্যানিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাবৃদ্ধির কারণেই এটি ঘটছে। এখনো বলা যাচ্ছ না যদিও, তবে জর্জিয়া এবং অ্যারিজোনার মতো স্টেটগুলোর ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে আসাটা একটা বিরাট ব্যাপার। নেভাডাও ব্যতিক্রম নয়, হিলারি ক্লিনটন নেভাডা পেয়েছিলেন ২০১৬-তে। বাইডেনও পেতে পারেন। বাইডেন এবারে না জিতলেও এই ধারা দেখা গেছে টেক্সাস এবং ফ্লোরিডায়। টেক্সাসে বাইডেন প্রায় ৬ শতাংশ ব্যবধানে হেরেছেন। হিলারি ক্লিনটনের ক্ষেত্রে যা ছিল ৯ শতাংশ। ফ্লোরিডার ল্যাটিনোরা মূলত কিউবান ইমিগ্র্যান্ট ও তাদের বংশধররা ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান। তবুও বারাক ওবামা দু-দু’বার জিতেছিলেন ফ্লোরিডায়। হিলারি ক্লিনটন ২ শতাংশেরও কম ভোটে হেরেছিলেন। এই ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। যদি থাকে, অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতির লাল-নীল মানচিত্র বদলে যাবে আমূল।

তিন. হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ এবং সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা তাদের প্রত্যাশা এবং ধারণা অনুযায়ী ভালো করেননি। জরিপের পূর্বানুমানও এক্ষেত্রে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। হাউজে ডেমোক্রেটিক পার্টির গোটা ছয়েক আসন বৃদ্ধির কথা ছিল, সেখানে তারা ১০টার মতো হারিয়েছেন সর্বশেষ পাওয়া তথ্য-ভিত্তিতে। সব আসনের ফলাফল জানা যায়নি। হাউজ যদিও ডেমোক্র্যাটদের কর্র্তৃত্বে থাকবে, সিনেট তাদের হাতে আসার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই ম্লান। আইওয়া এবং মেইনে রিপাবলিকানরা তাদের সিনেট আসন ধরে রাখতে পেরেছেন। এগুলো নড়বড়ে ছিল। কলোরাডো এবং অ্যারিজোনায় ডেমোক্র্যাটরা নতুন আসন লাভ করতে যাচ্ছেন। জর্জিয়ায় ফল চূড়ান্ত হয়নি। তবে ডেমোক্র্যাটরা আশাবাদী।

চার. এই নির্বাচনকে যেভাবে ট্রাম্পের পক্ষে-বিপক্ষে রেফারেন্ডাম হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, তা খুব একটা ভুল ছিল না, তবে পুরোপুরি সঠিক বলেও প্রমাণিত হয়নি। হাউজ এবং সিনেটে রিপাবলিকানদের ভালো ফল তাই নির্দেশ করে। ডেমোক্রেটিক পার্টির দলগত অবস্থান ট্রাম্প-বিরোধিতার ফলে দুর্বল না হলেও আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়নি। বাইডেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার (যদি হন) পেছনে মূল কারণ তার পার্টি নয় বরং ট্রাম্পের ওপর বীতশ্রদ্ধ ভোটারেরা, এদের মধ্যে রিপাবলিকানরাও আছেন বিপুল সংখ্যায়। ট্রাম্পের সমর্থকদের মতো এবার ট্রাম্পবিরোধীরাও ছিলেন বেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

পাঁচ. করোনাভাইরাসই ট্রাম্পকে ডোবাবে এমনটাই ধারণা ছিল সবার। তবে মনে হয় হয়েছে উল্টোটা। করোনাভাইরাস ট্রাম্পকে সাহায্য করেছে। অনেকেই বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দীর্ঘায়িত লকডাউনের বিরোধী। তাদের ভয় ছিল বাইডেন লকডাউন চাপিয়ে দেবেন আবারও আরও কঠিনভাবে।

ছয়. ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে। ট্রাম্পের অর্বাচীনসুলভ কথাবার্তা এবং ন্যায়নীতির তোয়াক্কা না করার প্রবণতা দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তার সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতার ঝোঁক রয়েছে। ট্রাম্প এদেরকে উসকানি দিতে পিছপা হবেন না। সুপ্রিম কোর্টে ৬-৩ রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে অনেকের মনে।

ফলাফল হয়তো কয়েক ঘণ্টা বা কালকের মধ্যেই জানা যাবে। কিন্তু সামনের বেশ কয়েকটা দিন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকবে মনে হচ্ছে।

ইমেরিটাস প্রফেসর, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

Irtishad@gmail. com

নভেম্বর ৬, ২০২০