ভন্ড নবাবের আসল নাম কামরুল হাসান হৃদয়

ভন্ড নবাব আলী হাসান আসকারীর প্রতারণার শিকার হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। যাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে এই ভুয়া নবাব ও তার চক্রের সদস্যদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন অন্তত ২০ জন ভুক্তভোগী, যারা সবাই পুলিশের কাছে প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। যার প্রেক্ষিতে তদন্তে নেমে পুলিশ কথিত নবাব আলী হাসান আসকারীর আসল পরিচয় উদ্ঘাটন করেছে। কথিত নবাব আলী হাসান আসকারীর প্রকৃত নাম কামরুল হাসান ওরফে হৃদয়। সে মূলত বিহারি বংশোদ্ভূত। গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

তারা আরও জানান, ভন্ডনবাব আলী হাসান আসকারী ও তার সহযোগী হিসেবে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ভন্ড নবাবসহ আপন চার ভাই রয়েছে। কিন্তু পুলিশের তিন দিনের রিমান্ডে তারা নিজেদের আপন ভাই হিসেবে অস্বীকার করেছিল। পরে সিটিটিসির তদন্তকারী দলের সদস্যরা ভন্ড নবাব আলী হাসান আসকারীর আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করেন। তাদের মাধ্যমে জানতে পারেন, এই চক্রের হোতা ভন্ড নবাব আলী হাসান আসকারীর প্রকৃত নাম কামরুল হাসান হৃদয়। এছাড়া তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আহম্মদ আলী, রাশেদ ও রানা আপন ভাই।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম জানান, ভণ্ড নবাব আলী হাসান আসকারীর নামে যে ব্যক্তির ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে সে তার চাচাত ভাই কামরুল ইসলাম হৃদয়। এছাড়া তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আহম্মদ আলী, রাশেদ ও রানাও তার আপন ভাই। তাদের বাবার নাম হাজী আবদুস সালাম। দাদার নাম হাজী সুলেমান। তারা মূলত বিহারি বংশোদ্ভূত। অনেক আগে পুরান ঢাকায় তাদের দাদা হাজী সুলেমানের নামে একটি বাড়ি ছিল। সেই বাড়িটি প্রকৃত ওয়ারিশদের ঠকিয়ে বিক্রি করে দেয় এই আসকারী ও তার ভাইয়েরা। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন তাজুল।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৃত ওয়ারিশদের ঠকিয়ে দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে কথিত নবাব। তারপর নিজেদের বংশ পরিচয় বদলে ফেলে আসল নবাবদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করতে থাকে। তবে আমাদের তদন্তে এই চক্রের হোতা ও তার সহযোগীদের প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। এছাড়া তদন্তে কথিত আলী হাসান আসকারীর আরও একাধিক ছদ্মনাম পাওয়া গেছে, যেসব নাম মূলত প্রতারণার কাজে ব্যবহার করত সে। এসব বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে।’

তদন্তকারী আরেক কর্মকর্তা জানান, কথিত এই নবাব আলী হাসান আসকারী তার প্রকৃত নামের বদলে আলী হাসান আসকারীর আগে কখনো সৈয়দ, আবার কখনো খাজা যুক্ত করে। এছাড়া তার বাবার নাম আবদুস সালাম হলেও বাবার নামের আগে ড. যুক্ত করেছে। দাদার নামও পরিবর্তন করেছিল সে। এছাড়া আপন ভাইদের বেতনভুক্ত কর্মচারী পরিচয় দিয়ে সারা দেশেই প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিল। এমনকি ঢাকার আহসান মঞ্জিলকেন্দ্রিক যত ফলের দোকান ছিল সেসব দোকান থেকেও নিয়মিত চাঁদা তুলেছে এই প্রতারক চক্র। ধীরে ধীরে তার সব প্রতারণার তথ্য বেরিয়ে আসছে। প্রতিদিনই রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ভুয়া নবাবচক্রের মাধ্যমে প্রতারিত ব্যক্তিরা এসে অভিযোগ করছেন। গতকাল শনিবার পর্যন্ত এই চক্রের প্রতারণার শিকার ২৪-২৫ জনের অভিযোগে প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন সেই টাকা তারা কোথায় লুকিয়ে রাখতে পারে এমন সম্ভাব্য জায়গা শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কথিত নবাব আলী হাসান আসকারী ও তার পাঁচ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ভ- নবাবের আপন ভাই রাশেদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাদের সবাইকে কারাগারে পাঠানো হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর কোথাও এই ভুয়া নবাবের গোপন বাসা রয়েছে। সেখানেই এই টাকা লুকিয়ে রেখেছে। এছাড়া আসকারীর স্ত্রী মেরিনা আক্তার ওরফে সাহেবা হেনা আসকারীর চুয়াডাঙ্গার সবুজপাড়া গ্রামের কোথাও এই টাকা গচ্ছিত থাকতে পারে। হাতিয়ে নেওয়া এসব টাকার সবই তারা নগদে নিয়েছে। কোনো ব্যাংকে রাখেনি। কোথাও তাদের টাকার সিন্দুক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, আলী হাসান আসকারী ও গ্রেপ্তার পাঁচ সহযোগীর মধ্যে মো. আহম্মদ আলী, রাশেদ ওরফে রহমত আলী ওরফে রাজা ও মো. বরকত আলী ওরফে রানা সবাই আপন ভাই। তাদের বাবার নাম হাজী মো. আবদুস সালাম। মায়ের নাম মৃত নাইমা খাতুন। নাইমা খাতুন মারা যাওয়ার পর তার বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। এই দুই মা মিলে তাদের পরিবারের মোট সাত ভাই দুই বোন ছিল। এদের মধ্যে দুজন মারা যাওয়ার পর বর্তমানে পাঁচ ভাই ও দুই বোন রয়েছে। সবার বড় ভাইয়ের নাম সাইফুল ইসলাম ও দ্বিতীয় ভাইয়ের নাম ছিল কামরুল ইসলাম হৃদয়। এই হৃদয়ই হলো কথিত নবাব আলী হাসান আসকারী। যে নিজের নাম বদলে নবাব পরিবারের বংশধর দাবি করতে থাকে। কামরুল হাসান হৃদয়ের বদলে আলী হাসান আসকারী নাম ধারণ করে নবাবের বংশধর সেজে নবাব এস্টেটের জমি দখলের চেষ্টা করে।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, প্রতারক আলী হাসান আসকারী জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, হৃদয় নামে তার এক ভাই ছিল যে ২০০৫ সালে সৌদি আরবে চাকরিকালে মারা যায়। তবে তার লাশ কোথায় দাফন হয় সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। পরে তদন্তে বের হয়ে আসে যে কামরুল হাসান হৃদয়ই হলো কথিত নবাব আলী হাসান আসকারী। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয় আহম্মদ আলী, রাজা ও রানা নামে তিন ভাই। এছাড়া তাদের আমিনুল ইসলাম নামে আরেক ভাই এবং রাজিয়া ও রুমি নামে দুই বোন রয়েছে। তবে ভন্ড নবারের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে কামরুল ইসলাম হৃদয় নামে যে ভাই সৌদি আরবে চাকরিকালে মারা যায় বলে তারা দাবি করেছে, প্রকৃতপক্ষে সেই কামরুলই আলী হাসান আসকারী নাম ধারণ করে প্রতারকচক্র গড়ে তুলেছে। যে চক্রে তিনভাইকে যুক্ত করলেও তাদের বেতনভুক্ত সহযোগী হিসেবে দাবি করে। এজন্য তাদের পরিচয় প্রমাণ করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তদন্তকারীরা আরও জানান, ভণ্ড নবাবের প্রকৃত বাড়ি ছিল পুরান ঢাকার লালাবাগের গৌরসুন্দর লেনের ২১ নম্বরে। সেখানকার বাড়ি বিক্রি করে কিছু সদস্য কামরাঙ্গীরচরে চলে যায়। আর চার ভাই মিলে প্রতারণার চক্র গড়ে তুলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া থাকা শুরু করে। প্রথমে উত্তরা ও কল্যাণপুর এবং পরে আরও একাধিক জায়গায় বাসা ভাড়া নেয়। একটি বাসায় তিন থেকে চার মাসের বেশি অবস্থান করেনি।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, ভুয়া নবাবচক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই ২৪ থেকে ২৫ জন ভুক্তভোগী এই নবাব চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে তাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। এদের মধ্যে মিজান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে সাত লাখ টাকা খুইয়েছেন। ফখরুল আলম ভূইয়া নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে। গাইবান্ধার তিনজনের কাছ থেকে হাতিয়েছে ১৩ লাখ টাকা। যারা অন্তত ১২ জনকে চাকরি দেবে বলে এই টাকা তুলে ভুয়া নবাবচক্রের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বিল্লাল নামে এক ব্যক্তিকে আসকারী জুটমিল থেকে বস্তা সরবরাহের কথা বলে তিন লাখ টাকা মেরে দিয়েছে। মাহমুদসহ পাঁচজনের কাছ থেকে নিয়েছে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা। ফেনীর প্রায় ৪০০ জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। গাজীপুরের তাজুল ইসলামের কাছ থেকে নিয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা। তাজুল ইসলাম এই টাকা নিয়েছিলেন সেখানকার ২৩ জন বেকার যুবকের কাছ থেকে। যাদের সবাইকে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। এছাড়া ইব্রাহিম নামে এক ব্যক্তি ৭ জনকে বিদেশে নেওয়ার কথা বলে ১৭ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন ভুয়া নবাবের হাতে। জামালপুরের মিজান নামে এক ব্যক্তি ২৮ জনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়ে চক্রের সদস্যদের কাছে দিয়েছিলেন। ইউরোপের পোল্যান্ডে ও সিঙ্গাপুরে পাঠানোর কথা বলে ১৩ জনের কাছ থেকে ৪৮ লাখ ১০ হাজার টাকা তুলেছিলেন মঞ্জুরুল নামে এক ব্যক্তি। যিনি পুরো টাকাই নবাব আসকারীর হাতে দিয়েছিলেন। এছাড়া আরও একাধিক ব্যক্তি প্রায় কোটি টাকার ওপরে এই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য এসেছে। তবে ওইসব ব্যক্তি কোনো মামলা করবেন না বলে জানিয়েছেন। মামলা না করার কারণ হিসেবে ওই ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, নবাব আসকারী ও তার লোকজন জামিনে বের হওয়ার পর ওইসব টাকা দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মামলা করলে আর টাকা দেওয়া হবেও না বলে হুমকি দিয়েছে। তাই তারা মামলা করতে চান না। কারণ এই ভুয়া নবাব ও সঙ্গীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্য সদস্যরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে অভিযোগ না করার কথা বলছে।

তদন্তকারী আরেক কর্মকর্তা জানান, সারা দেশেই বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক এই ভুয়া নবাবচক্রের সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে পাবনা, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলের দায়িত্বে রয়েছেন বিপ্লব ভুইয়া নামে এক দালাল। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের আরও একাধিক দালালের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতারণার জাল বিস্তারের কাজে একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও ব্যবহার করেছে এই ভুয়া নবাব। পর্যায়ক্রমে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা দেশে নবাব পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে প্রায় ১৬ হাজার একর ভূমি রয়েছে। এসবের অনেক জায়গা নিয়েই বিভিন্ন ব্যক্তি নবাব পরিবারের বংশধর দাবি করে আদালতে মামলা করেছেন। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে ভুয়া নবাব আলী হাসান আসকারী। তিনি মূলত ২০১৪ সাল থেকে পরিকল্পিতভাবে নিজেকে নবাব পরিবারের বংশধর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য নানা ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়। ছলচাতুরীর অংশ হিসেবে তিনি নবাব এস্টেটের মাধ্যমে নবাব পরিবারের কাগজপত্র সংগ্রহ করে। সেই মোতাবেক নবাব আলী হাসান আসকারীর নাম ধারণের চেষ্টা করে।

সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের উপকমিশনার মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুয়া নবাব আলী হাসান আসকারীর প্রকৃত পরিচয় উদঘাটন হয়েছে। এখন প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকার খোঁজ করা হচ্ছে। এছাড়া তার চক্রের সদস্য হিসেবে আরও অনেকেই রয়েছে, যাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’