অভিনয় মিস করেন আলী যাকের

গত ৬ নভেম্বর ৭৬ বছরে পা রাখলেন দেশের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। এক একটি চরিত্রকে তিনি যেভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন তা অতুলনীয়। কী টেলিভিশন, কী মঞ্চ আলী যাকের আলাদা। অভিনয়টা হৃদয় দিয়ে ধারণ করেছেন বলেই হয়ত তিনি এতই সাবলীল প্রতিটি চরিত্রে। এখনো অভিনয়ের প্রতি তার তীব্র আকাক্সক্ষা। কিন্তু শরীর সাড়া দেয় না বলে তাকে অভিনয়ের জগতে পাওয়া যায় না। দু’বছর আগেও তাকে মঞ্চে গ্যালিলিও নাটকে দুর্দান্ত অভিনয় করতে দেখা গেছে। মাঝে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন, এখন শরীর ভালো। করোনাকালে একদমই ঘর থেকে বের হননি। তার প্রতিষ্ঠা করা বিজ্ঞাপনী সংস্থা এখন দেখাশোনা করেন ছেলে ইরেশ যাকের ও মেয়ে শ্রিয়া সর্বজয়া। স্ত্রী সারা যাকেরও অনেক কাজ সামলান।

জন্মদিনে ঢাকাতেই ছিলেন আলী যাকের। ছেলে ইরেশ যাকের বলেন, ‘ঘরোয়াভাবেই বাবার জন্মদিন উদযাপন করেছি আমরা। এখন যে দিনকাল তাতে ঘটা করে কিছু করা শোভনীয় নয়। তারপরও তিনি আমাদের কাছে বিশেষ মানুষ। তার বিশেষ দিনটি আমাদের কাছে অনেক বেশি আনন্দের।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবা আমার বন্ধু, আমার আইডল। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ যে দু-তিনজন, তার মধ্যে তিনি একজন। সন্তান হিসেবে চাই বাবা আমাদের সঙ্গে সুস্থভাবে আজীবন এভাবেই থাকুক। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’

এখন নিজের মতো করেই সময় কাটান আলী যাকের। অনলাইনে খবর পড়েন, টিভি দেখেন। আজকাল স্পিকারে গান শুনতে তার খুব ভালো লাগে। তার যৌবনকালের গানগুলো বেশি শোনেন। হেমন্ত মুখার্জি, মান্না দে, কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, মানবেন্দ্র মুখার্জির গান বেশি শোনেন। আর বই পড়ার অভ্যাস তো বহু পুরনো। ভালো অভিনয়শিল্পীদের নাটকও দেখেন ইউটিউবে। ছেলেমেয়ের অভিনয় নিয়ে তিনি কী ধরনের মন্তব্য করেন, জানতে চাইলে ইরেশ যাকের বলেন ‘এক সময় অভিনয় নিয়ে বাবার সঙ্গে অনেক বেশি গল্প হতো। এখন কম হয়। তারপরও মাঝে মাঝে কথা হয় এ নিয়ে। আমাদের অভিনয় নিয়ে তিনি খুব একটা জাজমেন্টাল নন। ভালো হলে ভালো বলেন, কোনো খামতি চোখে পড়লে সেটিও বলেন। এতে আমরা এক ধরনের পিওর দিকনির্দেশনা পাই।’

ঢাকায় কর্মক্ষেত্র, সংসার, পরিবার ও আজকের আলী যাকের হয়ে ওঠা। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতি তার দুর্বলতা এখনো আগের মতোই। মাঝে মাঝে ছুটে যান সেখানে। এই তো জন্মদিনের পরদিনই তিনি সেখানে ছুটে গেছেন স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে। যাওয়ার পথে গাড়িতে থাকা অবস্থায় সারা যাকের বলেন, ‘গ্রাম তার খুব প্রিয়। আমিও খুব ভালোবাসি। আমার শ^শুরবাড়িতে তো ঘর ছিলই, কিন্তু ১৯৯৭ সালের দিকে তিনি নিজের মতো করে বাড়িঘর করেছেন। এখানে তেমন কেউ থাকে না। শুধু তার এক চাচাতো ভাইয়ের ছেলে থাকে। তারপরও আমরা এখানে আসি। সবুজ প্রকৃতি আর সহজ-সরল মানুষের অকৃত্রিম ব্যবহার খুব মুগ্ধ করে। বর্ষার সময় এলে মনে হয় জাহাজের মধ্যে ভেসে আছি। চারপাশে পানি আর পানি। ঢাকা থেকে এত দূরে ছুটে আসি শুধু মানসিক শান্তি পাই বলেই।’

দক্ষ অভিনেতা না হলে হয়ত আলী যাকেরকে মানুষ এভাবে হৃদয়ে স্থান দিতেন না। সেই অভিনয় থেকে এখন তিনি দূরে। কতটা মিস করেন, জানতে চাইলে বলেন ‘প্রচ- মিস করি।’ সারা যাকের বলেন, ‘সত্যি অভিনয়টা মন থেকে ভালোবাসেন। ভালো অভিনেতাদের অভিনয় তো বটেই, ইন্টারভিউ পর্যন্ত ইউটিউবে সময় করে দেখেন। বুঝতে চেষ্টা করেন এখনকার প্রজন্ম অভিনয় নিয়ে কী ভাবছে? আমাদের অভিনয় জগৎ কোন দিকে যাচ্ছে? শরীর সায় দিলে তিনি আবারও অভিনয় করতে চান।’

শিল্পকলায় অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার আলী যাকেরকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৭২ সালের আলী যাকের আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় মুনীর চৌধুরীর কালজয়ী ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে। সে বছরই যোগ দেন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে। এই দলের অনেক জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় ও নির্দেশনা দেন তিনি। চলচ্চিত্র আগামী (১৯৮৬), নদীর নাম মধুমতী (১৯৯৬), লালসালু (২০০১), রাবেয়া (২০০৮), টিভি নাটক বহুব্রীহি (১৯৮৮), আজ রবিবার (১৯৯৯), একদিন হঠাৎ (১৯৮৬), নীতু তোমাকে ভালোবাসি, অচিনবৃক্ষ, আইসক্রিম, পা-ুলিপি, গণি মিয়ার পাথর ও মঞ্চনাটক বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ, বাকি ইতিহাস, তৈল সংকট, দেওয়ান গাজীর কিস্সা, অচলায়তন, কোপেনিকের ক্যাপ্টেন, ম্যাকবেথ, টেমপেস্ট, নূরলদীনের সারাজীবন, গ্যালিলিও এবং কাঁঠাল বাগানে তার অভিনয় আজীবন দর্শক মনে রাখবেন।