কৃষিমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম নিশ্চিত করতে হলে ভ্যালু চেইন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন নিশ্চিতের মাধ্যমে কৃষি খাতকে লাভজনকে পরিণত করার তাগিদ দেন তিনি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে ফুড ভ্যালু চেইন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি এ সময় খাত আধুনিকায়নে খরচ কমাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্বারোপ করেন। বলেন, দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন নিশ্চিতের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করা সম্ভব। কৃষি প্রক্রিয়াজাত সেন্টার ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরির জন্য পূর্বাচলে দুই একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারকে সহযোগিতার জন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান কৃষিমন্ত্রী।
মূল বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড রুরাল ইন্ডাস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম বোরহান উদ্দিন বলেন, কৃষিভিত্তিক ফুড ভ্যালু চেইনে ইনপুট, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ভোক্তাদের মধ্যে তা বিতরণ নিশ্চিতÑ এ চার বিষয় জড়িত। তিনি জানান, পৃথিবীতে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। পোলট্র্রি খাত গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে। এ খাত বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সহায়তা প্রয়োজন। এছাড়াও কম খরচে কৃষিভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি, উদ্যোক্তাদের নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের সচেতনতা বাড়ানো, আর্থিক সহায়তা প্রদান, ‘কন্ট্রাক ফার্মিং’ আরও জনপ্রিয় করাতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন ধারা অব্যাহত রাখতে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার সঙ্গে ৪ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ, বাজেটে কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি ও ধান কাটা সহজে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়েছে। এ উদ্যোগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। চেম্বার সভাপতি বলেন, ফুড ভ্যালু চেইন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, মূলধন স্বল্পতা, পণ্য সংরক্ষণের অভাব, দুর্বল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা নিরসনে দেশে আবাদযোগ্য প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর পতিত জমিতে চাষের উদ্যোগ গ্রহণ, বিশেষায়িত কৃষিপণ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সরবরাহ নিশ্চিত, প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতি প্রণোদনা প্রদান, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, গুণগত মান রক্ষায় বিএসটিআইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
ইউনিমার্ট-ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক মালিক তালহা ইসমাইল বারী কৃষিপণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিতে যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণে স্টোরেজ ব্যবস্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসিং অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. ইকতাদুল হক বলেন, সাপ্লাই চেইন সচল রাখা না গেলে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা যাবে না। মৌসুমের শুরুতে নির্দিষ্ট পণ্যের স্থানীয় চাহিদার বিষয়ে জানানো হলে কৃষকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদন করতে পারবে। এতে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর সঙ্গে রপ্তানিও সম্ভব হবে। বিশেষায়িত পণ্য সংরক্ষণে পণ্য উৎপাদন এলাকায় হিমাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স) উজমা চৌধুরী বলেন, কৃষি খাতের জন্য ফুড ভ্যালু চেইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এজন্য কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করতে কিছু কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ ধরনের পণ্য আমদানিতে নীতি সহায়তা প্রয়োজন। এছাড়া উৎপাদিত কৃষিপণ্যের তথ্য অনলাইনে সন্নিবেশিতকরণের প্রস্তাব দেন।
কারন্যাল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. সালেহ আহমেদ বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদনে সার, কীটনাশক এবং অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহারে ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও পণ্য বাজারজাত প্রক্রিয়ায় যেন ক্ষতিকারক কোনো বিষয় না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।
ওয়েবিনারে অংশ নেন ডিসিসিআইর সহসভাপতি মোহাম্মদ বাশিরউদ্দিন, পরিচালক এনামুল হক পাটোয়ারী, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ প্রমুখ।