কমলার বিজয়ে কালো মেয়ের চোখে জল

নির্বাচিত হয়ে আড়াইশো বছরের মার্কিন ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেই শুধু নয়, আরও বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়েছেন কমলা হ্যারিস। ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিকের শরীরে বইছে দুই মহাদেশের রক্ত। তাই তার বিজয়ে মিশে আছে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আর ভারতীয়দের স্বপ্ন পূরণের গল্পও। লিখেছেন পরাগ মাঝি

চেস সেন্টারের বিজয় মঞ্চে

আমেরিকার সময় অনুযায়ী শনিবার রাতে ডেলওয়্যারে উইলমিংটনের চেস সেন্টারে কমলা হ্যারিস যখন তার বিজয় ভাষণ দেওয়ার জন্য স্টেজে ওঠেন, তখন তার হাত ধরেই আমেরিকায় রচিত হয়েছে এক নতুন ইতিহাস। আড়াইশো বছরের মার্কিন ইতিহাসে তিনিই প্রথম কোনো নারী যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো তার গায়ের কালো রং। সাড়ে ছয় দশক আগে এই আমেরিকাতেই ন্যূনতম নাগরিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল যে কালো মানুষরা, কমলা হ্যারিস যেন আজ তাদেরই প্রতিনিধি। হোয়াইট হাউজ জয় করা এই নারীর ঝুলিতে আরও বেশ কয়েকটি রেকর্ড জমে গেছে। শুধু নারী কিংবা কালো নন, তিনিই প্রথম দক্ষিণ-এশীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউজের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে কোনো অভিবাসী দম্পতির মেয়ে হিসেবে তিনিই প্রথম।

তাই কমলা হ্যারিস যখন তার বিজয়ী ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বহু মানুষের আশা ও স্বপ্নকেও। ভাষণের শুরুতেই টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে দর্শক সারিতে মার্কিন পতাকা হাতে থাকা এক কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের মুখ। অঝোর ধারায় কাঁদছিল মেয়েটি। এই কান্না বিজয়ের। ভাষণের শুরুতেই কমলা বলেন, ‘আমিই হয়তো এই অফিসে প্রথম কোনো নারী, কিন্তু এটাই শেষ নয়।’

সাদা রঙের একটি কমপ্লিট স্যুট পরে মঞ্চে উঠেছিলেন কমলা। কয়েক দশক ধরেই এই সাদা রংটিই আমেরিকার নারী অধিকার কর্মীদের ঐক্যের প্রতীক। আমেরিকার ইতিহাসে এর আগে মাত্র দুজন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে লড়েছেন। ২০০৮ সালে রিপাবলিকান পার্টির হয়ে সারাহ পেলিন এবং ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির জেরালডিন ফেরারো। তাদের কেউই নির্বাচিত হতে পারেননি। এদিকে, কোনো কারণে জো বাইডেন তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ক্ষমতা ছেড়ে দিলে কমলার হ্যারিসের হাত ধরেই আমেরিকা পেয়ে যেতে পারে তাদের প্রথম নারী প্রেসিডেন্টও। তাই বলা যায়, ইতিমধ্যেই কমলা যে রেকর্ডগুলো গড়েছেন সেগুলোই শেষ নয়। ভবিষ্যতে আরও বেশ কিছু রেকর্ড যে তার হাত ধরে রচিত হবে তা সহজেই অনুমেয়।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৭৭ বছর বয়সী বাইডেন হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়া সবচেয়ে বেশি বয়সী রাজনীতিক। ফলে হোয়াইট হাউজে এক মেয়াদের বেশি তার থাকার সম্ভাবনা কম বলেও অনেকে মনে করছেন। সে ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কমলার সম্ভাবনাই সবচেয়ে উজ্জ্বল।

কালো মানুষের আন্দোলন

সাম্প্রতিক সময়ে মহামারীর মধ্যেই আমেরিকায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ‘ব্ল্যাক লাইভস মেটার’ আন্দোলন। কারণ মহামারীর মাঝামাঝিতে গত ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপলিসে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার নির্যাতন করে মেরে ফেলেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে। তবে এই আন্দোলনের প্রথম শুরুটা হয়েছিল আরও আগে ২০১৩ সালে। কারণ এর আগের বছর নিছক সন্দেহের বশে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের স্যানফোর্ডে ট্রেভর মার্টিন নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে গুলি করে মেরে ফেলেছিলেন জিম্মারম্যান নামে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ। কিন্তু এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে জিম্মারকে বেকসুর খালাস দেয় আদালত। এই বিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে আমেরিকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তখন থেকেই কালো মানুষের ন্যায় বিচার পাওয়ার দাবিতে ‘হ্যাশট্যাগ ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর কার্যক্রম শুরু হয়; যার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে আসে আন্দোলনকারীরা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আগে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন কমলা হ্যারিসের জন্য ছিল এক বাড়তি অনুপ্রেরণা। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার অর্জনে একটি মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে।

তবে কমলা হ্যারিসের বিজয় আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে আরও বৃহৎ পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্বের ইতিহাস। একসময় এই দেশটিতে দাসবৃত্তির জন্য আফ্রিকা থেকে কালো মানুষদের ধরে নিয়ে আসা হতো। কয়েকশ বছর ধরে এমনটি চলার পর ১৮৬৩ সালে এই প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও বিশাল এই দেশটিতে অবস্থান করা কৃষ্ণাঙ্গদের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার ছিল না। এমনকি ভোটাধিকারও ছিল না তাদের। এ অবস্থার হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। সে সময় হাড়কাঁপানো শীতের একটি দিনে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের মন্টগোমারিতে একটি বাসে উঠেছিলেন রোজা পার্কস নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী। বাসের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রাখা একটি আসন খালি দেখে বসে পড়েন তিনি। কিন্তু বাসচালক দাঁড়িয়ে থাকা এক শ্বেতাঙ্গকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য ‘নির্দেশ’ দেন রোজাকে। কিন্তু অনড় রোজা সেই নির্দেশ মানতে নারাজ, বরং রুখে দাঁড়ান তিনি।

সে সময় আলাবামায় শ্বেতাঙ্গদের সুবিধা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আইন ছিল, যার ফলে গণপরিবহনেও বর্ণবৈষম্য-জাতিবিদ্বেষের শিকার হতেন কৃষ্ণাঙ্গরা। সেই আইনের জোরেই সেদিন গ্রেপ্তার করা হয় রোজাকে। সেই ঘটনাটি আমেরিকার ‘নাগরিক অধিকার আন্দোলন’-এর মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই আন্দোলনের সূত্র ধরেই আমেরিকায় কালোদের ভোটাধিকারসহ নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর কেটে গেছে কয়েক দশক। মানুষ হয়েছে আরও আধুনিক আর সমাজ হয়েছে উন্নত। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও মার্কিন সমাজের সাদা-কালোর ভেদাভেদ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো প্রকটভাবে রয়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রেভর মার্টিন, জর্জ ফ্লয়েডকে মেরে ফেলতে হাত কাঁপেনি মার্কিন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের। এ অবস্থায় নিজেদের মানুষ দাবি করে হোয়াইট হাউজের সামনে এসেও প্রতিবাদ জানায় ব্ল্যাক লাইভস মেটারের সমর্থকরা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কালোদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সহমর্মিতার জন্যই কমলা হ্যারিসকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। কারণ কমলার শরীরে একই সঙ্গে বয়ে চলেছে আফ্রিকান ও দক্ষিণ এশীয় রক্ত।

বাইডেনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন কমলা হ্যারিস। নিজের বক্তৃতায় ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দুঃখকে উনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। জো ক্ষমতায় এলে আমাদের সবাইকে একত্রে বেঁধে রাখবেন।’

ট্রাম্পের প্রশাসনকে খোঁচা দিয়ে কমলা আরও বলেন, ‘জাতিবিদ্বেষের কোনো প্রতিষেধক হয় না।’ এবারের নির্বাচন এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রসঙ্গও নিজের বক্তৃতায় বারবার তোলে ধরেন কমলা।

এক অঙ্গে তিন মহাদেশ

জাতি হিসেবে আমেরিকানরা যে বৈচিত্র্যের দাবি করে কমলা হ্যারিস যেন তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। জন্মসূত্রে আমেরিকান এই নারীর শরীরে বয়ে চলেছে আরও দুই মহাদেশের রক্ত। তারও আছে এক ইতিহাস। যে ইতিহাসের শুরু তার মা-বাবার প্রণয়ের মধ্য দিয়ে।

ষাটের দশকের আমেরিকা তখন উত্তাল। কালোদের অধিকার নিয়ে চলছে আন্দোলন-সমাবেশ। চলছে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার বিভিন্ন পক্ষ। বাক্স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার মার্কিন নাগরিকরা। ব্রিটিশ উপনিবেশের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে দলে দলে অভিবাসীরা ভিড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা সোচ্চার। সেই টালমাটাল সময়ে দেখা হয় কমলার বাবা ও মায়ের।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বারকেলিতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লম্বা ক্ষীণ স্বাস্থ্যের পিএইচডি শিক্ষার্থী ছোট একটি জটলার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজের দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন ওই তরুণ। রুমভর্তি একদল কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন তাদের দেশে ব্রিটিশ উপনিবেশের কথা। তিনি বলছিলেন, একদল ‘সাদা মানুষ’ এক শ্রেণির ‘এলিট ব্ল্যাক’ তৈরির মাধ্যমে বিভেদ সৃষ্টি করছে।

ব্রিটিশশাসিত জ্যামাইকার ওই তরুণের নাম ডোনাল্ড জে হ্যারিস। তখন তার বয়স ছিল ২৪। তার বক্তৃতা শুনে সেই ছোট সমাবেশে আবির্ভাব ঘটে এক তরুণীর। শাড়ি ও স্যান্ডেল পরা সেই তরুণী একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী। তার দেশেও ছিল ব্রিটিশ শাসন। সেদিনের সমাবেশে সবার মধ্যে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।

তার নাম শ্যামলা গোপালান। একই বছরে শ্যামলা ও হ্যারিসের জন্ম। তারা উভয়ই ব্রিটিশশাসিত দেশের নাগরিক। সরকারি কর্মকর্তার মেয়ে শ্যামলার মনে আরও কৌতূহল ছিল হ্যারিসের বক্তৃতা শোনার। তিনি হ্যারিসকে বলেছিলেন, ‘আমি আপনার কথা আরও শুনতে চাই ।’

সেদিনের সেই স্মৃতি স্মরণ করে বর্তমানে ৮২ বছর বয়সী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রথিতযশা শিক্ষক হ্যারিস বলেন, ‘এটা ছিল খুবই উৎসাহব্যঞ্জক এক ঘটনা। কেউ একজন বিশ্বাস করছে যে সম্ভব, এটা আমাকে পুলকিত করল। পরবর্তী সভায় আমাদের আবার কথা হলো। এভাবে আমাদের কথা চলতেই থাকল। আর বাকিটা তো ইতিহাস।’

ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত দেশগুলোতে যারা মেধাবী, তাদের ব্রিটেন থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হতো। তবে হ্যারিস ও শ্যামলা রাজি ছিলেন না ব্রিটেনে যেতে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। হ্যারিসের জন্য বিষয়টা সহজ হলেও শ্যামলার জন্য ছিল কঠিন। কারণ তিনি একজন নারী।

ভারতের এক উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ পরিবারের বড় সন্তান শ্যামলা। তিনি চেয়েছিলেন বায়োকেমিস্ট্রি হতে। তবে তাকে বাধ্য করা হয় ব্রিটিশদের নির্মিত লেডি আরউইন কলেজে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের ডিগ্রি নিতে। তার বাবা আর ভাইয়েরা ভেবেছিলেন এটাই যথেষ্ট।

তার ভাই গোপালান বালাচন্দ্রান বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে এমনভাবে মজা করতাম, যেন আমাদের কোনো দায় ছিল না। আমরা তাকে বলতাম গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে তুমি কি পড়েছো? কীভাবে ডিনারের প্লেট সাজাতে হবে এসব?’

এর মধ্যে নিজ উদ্যোগে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে প্রাণরসায়নের ডিগ্রি অর্জন করেন শ্যামলা। তবে তার বাবা এতে ভয় পেয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রে তার পরিচিত কেউ নেই, কীভাবে শ্যামলা থাকবেন এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাকে আশ্বস্ত করেন শ্যামলার ভাই। শ্যামলার পড়াশোনার খরচের দায়িত্বও তিনি নেন।

১৯৬১ সালে কয়েক হাজার মাইল দূরের হ্যারিসের জীবনেও একই ঘটনা ঘটে। তিনি অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাকে সম্মানসূচক বৃত্তিও দিয়েছিল ব্রিটেনে পড়ার জন্য। তবে ব্রিটিশ সংস্কৃতি পছন্দ করতেন না হ্যারিস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই যাবেন বলে ঠিক করলেন। তার কাছে মনে হতো যুক্তরাষ্ট্র অনেক জীবন্ত, অনেক পরিবর্তনশীল, বিচিত্র ও জটিল একটি দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রে এসে শ্যামলা জড়িয়ে পড়েন একদল বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে। সেখানে তিনি আফ্রো-আমেরিকান পাঠচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬১ সালে হ্যারিসও সেই পাঠচক্রে যুক্ত হন। এরপরই হ্যারিস ও শ্যামলার প্রেম হয়। তারা বিয়ে করারও সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৪ সালে তাদের প্রথম সন্তান কমলার জন্ম হয়। কমলার যখন পাঁচ বছর, তখন হ্যারিস ও শ্যামলার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। শিক্ষকতার সূত্রে হ্যারিস উইসকনসিনে চলে যান, শ্যামলা নিজের মতো করে চলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কমলা ও তার বোনসহ দুই মেয়েকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডেই থেকে যান। নিজেদের দুই মেয়েকে তিনি বড় করতে থাকেন কৃষ্ণাঙ্গদের মতো করেই।

সেই বিচ্ছেদের সময় নিয়ে কমলা তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, তখন আমার মনে হয়েছিল বাবা আর মা যেন তেল আর জল। আমি ভাবতাম হয়তো তারা অনেক পরিণত বয়সে পৌঁছে গেছেন, তাই এমন হচ্ছে।

এরপর ১৯৭২ সালে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আদালতে আবেদন করেন শ্যামলা। তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কমলা জানান, আমার বাবাই ছিলেন আমার মায়ের একমাত্র ছেলেবন্ধু। এরপর কৃষ্ণাঙ্গদের সমাজে বেড়ে উঠতে থাকেন তারা। ২০০৯ সালে সেখানেই মারা যান শ্যামলা। তবে কমলার বাবা এখনো বেঁচে আছেন। তিনি আমেরিকান-জ্যামাইকান অর্থনীতিবিদ হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। সব সময় নিজ দেশ, মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার তিনি। শ্যামলার সঙ্গে দীর্ঘ প্রেমের পর বিচ্ছেদ তিনি মেনে নিতে পারেননি। শ্যামলাকে আজও তার মনে পড়ে।

এমন অতীত ইতিহাসের জন্যই কমলার বিজয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের পাশাপাশি ভারতীয়রাও খুব খুশি। তার মায়ের সম্পর্কের আত্মীয়রা এখনো ভারতে বসবাস করছেন।