আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অভিযানের মধ্যেও নকল ব্যান্ডরোলে বিড়ির রমরমা ব্যবসা থামছে না। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার হাট-বাজারগুলো নকল ব্যান্ডরোল ও ব্যান্ডরোলবিহীন বিড়িতে সয়লাব হয়ে গেছে। কিছু অসাধু বিড়ি ব্যবসায়ী ও কোম্পানি এই অবৈধ কারবার চালিয়ে কামাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকার বছরে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব হারালেও এসব বিড়ি ব্যবসায়ী ও কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুল্ক বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও বিড়ি প্রস্তুতকারক সমিতির নেতাদের সহযোগিতায় এই নকলযজ্ঞ চলছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অভিযোগ জমা পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুদক ও এনবিআরের পাশাপাশি নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে র্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
বিড়ির নকল ব্যান্ডরোল বাজারজাতকারী চক্রের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুদক ও এনবিআরে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন রাজধানীর দক্ষিণ শাহজাহানপুরের বাসিন্দা মো. ওয়াহিদুজ্জামান। এতে তিনি বলেন, শক্তিশালী একটি চক্র নকল ব্যান্ডরোল বাজারজাত করে প্রতি মাসে সরকারের শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এ চক্রের হোতা রংপুর জেলা বিড়ি ফ্যাক্টরি মালিক সমিতির সভাপতি মজিবুর রহমান। আর রংপুর বিভাগীয় কাস্টম, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ের কমিশনার শওকত আলী সাদী এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণে পদে থেকে অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে বিড়ির নকল ব্যান্ডরোল কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশ করছেন। মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু রাজস্ব কর্মকর্তা নকল ব্যান্ডরোল কারবারকে উৎসাহিত করে চলেছেন। বিশেষ করে যাচাই-বাছাই ছাড়া অনলাইনে বিড়ি ফ্যাক্টরির লাইসেন্স দেওয়ায় তারা সরকারি ব্যান্ডরোল ক্রয় না করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ভুয়া ব্যান্ডরোল দিয়ে বিড়ি-সিগারেট বাজারজাত করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর কাস্টম এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনাররেট ড. শওকত আলী সাদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত এক মাসে আমরা নকল ব্যান্ডরোল বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে ১৮৬টি অভিযান পরিচালনা করে ২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করেছি। আমরা জোরদার অভিযান পরিচালনার কারণে অনেকে এখন আমাদের বিরুদ্ধেই যোগসাজশের অভিযোগ করছে। আমরা অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান না চালিয়ে অফিসে বসে থাকলে কেউ অভিযোগ দিত না। আমরা চাই আইন অমান্যকারী ও রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সবাইকে আইনের আওতায় আনতে।’
বিড়ি কারখানার অনলাইন নিবন্ধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনলাইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন করায় কেউ জালিয়াতি করার সুযোগ পায় না। সেখানে নির্ধারিত ছকে সব শর্ত পূরণ করে নিবন্ধন নিতে হয়। তাই অনলাইন নিবন্ধনে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই।’
এদিকে শুধু নকল ব্যান্ডরোল কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশই নয়, শুল্ক বিভাগের লোকজন নকল ব্যান্ডরোলের মামলা নিজ স্বার্থেও ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাবনার ভাঙ্গুড়ার বাসিন্দা হাসিনুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, তার আপন চাচা জাহিদুল ইসলাম পাবনার শুল্ক বিভাগের ডেপুটি কমিশনার। জমিসংক্রান্ত ও পারিবারিক বিরোধের কারণে ব্যান্ডরোল জালিয়াতির পাঁচটি মামলায় পরিকল্পিতভাবে হাসিনুরকে ফাঁসিয়ে দেন জাহিদ। বিশেষ ক্ষমতা আইনে পাবনার ফরিদপুর, আতাইকুলা ও সদরসহ বিভিন্ন থানায় পাঁচ মামলার আসামি এখন হাসিনুর। কাস্টমস কমিশনারকে বিষয়টি জানিয়েও কোনো সুরাহা পাননি তিনি।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে পাবনার শুল্ক বিভাগের ডেপুটি কমিশনার জাহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে এখন কোনো কথা বলব না।’
দুদক ও এনবিআরে জমা হওয়া অভিযোগমতে রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে একচেটিয়া নকল ব্যান্ডরোলের কারবার পরিচালনা করছে একটি চক্র। রংপুর জেলায় ছোট-বড় মিলে তালিকাভুক্ত বিড়ি কারখানার সংখ্যা ২৭৮টি। এর মধ্যে হারাগাছ এলাকাতেই বেশিরভাগ কারখানা। ইতিমধ্যে বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে চালু থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে মাত্র ২০টি নিয়মিত বিড়ি-সিগারেটের প্যাকেটে সরকারের সরবরাহকৃত ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে থাকে। বাকি দেড়শর বেশি কারখানার মালিক ভুয়া ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে উৎপাদিত বিড়ি বাজারজাত করছে।
নকল ব্যান্ডরোল বাজারজাতকারী চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জেলা বিড়ি ফ্যাক্টরি মালিক সমিতির সভাপতি মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সমিতির সদস্য সংখ্যা ২০। আমিসহ সমিতির নেতারা ব্যান্ডরোল জালিয়াতি করে কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার আছি। আমাদের কোনো সদস্য এসব জালিয়াতিতে জড়িত নয়। আমরা জালিয়াতির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করি। এতে কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে দুদক বা এনবিআরে আমাদের নামে অভিযোগ দিয়ে থাকতে পারে।’
দুদক ও এনবিআরে ওয়াহিদুজ্জামানের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, রংপুরের স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার প্রতিষ্ঠানের নাম আশিক বিড়ি ফ্যাক্টরি। এ প্রতিষ্ঠানটি বাজারে বিক্রি করা বিড়ির প্যাকেট সংগ্রহ করে সেখান থেকে ব্যান্ডরোল উঠিয়ে তা পুনরায় ব্যবহার করে। এছাড়া হাটবাজার থেকে বিভিন্ন কোম্পানির বিড়ির প্যাকেট সংগ্রহ করে দেখা গেছে এতে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল নকল, যা সরকারের সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রেসে ছাপা হয়নি। সম্প্রতি র্যাব রংপুরের কাউনিয়া ও হারাগাছসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশকিছু অভিযান চালায়। কিন্তু নকল ব্যান্ডরোল বাজারজাতকারী চক্র এতই শক্তিশালী যে এসব অভিযানের পরও তাদের দমন করা যাচ্ছে না। আর শুধু রংপুর বিভাগেই নয়, টাঙ্গাইল, শেরপুর, পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধাসহ অন্যান্য জেলায় একই চক্র নকল ব্যান্ডরোল সরবরাহ করে।
সম্প্রতি শেরপুরের ইদ্রিস অ্যান্ড কোম্পানি এবং রাশিদা বিড়ি কোম্পানিতে র্যাব, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল নকল ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়। এছাড়া জব্দ করা হয় প্রায় আগে ব্যবহৃত সাড়ে তিন লাখ ব্যান্ডরোল।
এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নতুন কৌশলে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে নকল ব্যান্ডরোল লাগাচ্ছে বিভিন্ন বিড়ি কোম্পানি। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি বিড়ির প্যাকেটের গায়ে একটি সরকারি ব্যান্ডরোল লাগানোর কথা। কিন্তু অধিকাংশ বিড়ি কোম্পানি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিড়ির প্যাকেটের গায়ে আসল ব্যান্ডরোল লাগাচ্ছে। বাকি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিড়ির প্যাকেটের গায়ে নকল ব্যান্ডরোল লাগানো হচ্ছে। যেসব বিড়ির প্যাকেটের গায়ে নকল ব্যান্ডরোল লাগানো হচ্ছে, সেসব বিড়ির প্যাকেটের জন্য সরকারকে কোনো ধরনের রাজস্ব দিতে হয় না। নকল ব্যান্ডরোল লাগানো বিড়ির প্যাকেটগুলো আসল ব্যান্ডরোল লাগানো বিড়ির সঙ্গে মিশিয়ে প্যাকিং করা হচ্ছে। আর পুরোপুরি নকল ব্যান্ডরোল লাগানো বিড়ি দেশের প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। আসল ব্যান্ডরোল লাগানো বিড়ি সরবরাহ করার সময় দোকানিকে প্যাকেট থেকে ব্যান্ডরোলগুলো তুলে আলাদা করে রেখে দেওয়ার কথা বলে আসে সরবরাহকারীরা। ওইসব ব্যান্ডরোল আবার শতকরা হিসাবে টাকায় কিনে নেয় কোম্পানি। এতে করে দোকানিরও লাভ বেশি হয়।
শুল্ক গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে টাঙ্গাইলের রাশিদা বিড়ি, মটর বিড়ি, মন্টু বিড়ি, হক বিড়ি, মুকুট বিড়ি, সাইদ বিড়ি, সিয়াম বিড়ি, মিরাজ বিড়ি, মিষ্টি বিড়ি ও নিউ মিরাজ বিড়ির বিরুদ্ধে নকল ব্যান্ডরোল এবং একই ব্যান্ডরোল পুনরায় ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার তথ্য মিলেছে।
একটি বিড়ি কোম্পানির মালিক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নকল ও জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারী বিড়ি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমরা পেরে উঠছি না। প্রতি প্যাকেট বিড়ির জন্য ব্যান্ডরোল বাবদ সরকারকে ৮ টাকা ১০ পয়সা দিতে হয়। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আমাদের এক প্যাকেট বিড়ি বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ টাকায়। এছাড়া সরকারি নির্দেশ মোতাবেক ২৫ শলাকার এক প্যাকেট বিড়ি ১৫ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অথচ নকল কারবারিদের কোনো শুল্কই দিতে হয় না।’
রংপুর অঞ্চলের একটি বিড়ি কারখানার মালিক শহীদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনলাইন নিবন্ধন পদ্ধতির কারণে যে কেউ বিড়ি কারখানার লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। বিগত সময়ে সরকারি বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে সরেজমিন প্রতিনিধি পাঠিয়ে বিড়ি কারখানাগুলোর নানাদিক ও কাগজপত্র পর্যবেক্ষণ-পরিদর্শন করে বিড়ি কারখানা স্থাপন, বিড়ি উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের লাইসেন্স দিত। কিন্তু অনলাইনে নিবন্ধন দেওয়ায় এর অনেক কিছুই এখন থাকছে ভুয়া। আর এসব কারখানাই নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে ব্যবসা করছে।’
বিড়ির প্যাকেটে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার বিদায়ী পরিচালক লে. কর্নেল সরোয়ার বিন কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যান্ডরোল জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে র্যাব বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। র্যাব এ অভিযান অব্যাহত রাখবে।’