মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে বড় জয়ের পথে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। নিজের নির্বাচনী আসনে জয়লাভ করেছেন দলটির চেয়ারম্যান ও বর্তমানে দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। এ নির্বাচনে এ পর্যন্ত দুই মুসলিম প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে মিয়ানমার টাইমস জানিয়েছে, বিজয় উৎসবের জন্য ইতিমধ্যে এনএলডির প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছেন সমর্থকরা।
দীর্ঘ ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসানের পর ২০১০ সালে মিয়ানমারে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেনাবাহিনীর মদদে নির্বাচন হচ্ছে দাবি করে ওই নির্বাচন বয়কট করে সু চির দল। এরপর ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেন সু চি। ওই নির্বাচনে সেনাবাহিনীর জন্য চার ভাগের এক ভাগ আসন নির্ধারিত ছিল। আর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী কোনোটাই হতে পারেননি সু চি।
করোনার মধ্যেই গত ৮ নভেম্বর মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আরাকান অঞ্চলের প্রায় ১৫-২৫ লাখ মুসলিম ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এ কারণে এই নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। আর এই নির্বাচনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।
মিয়ানমারের সাড়ে ৫ কোটি নাগরিকের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। দেশটিতে মোট ভোটার ৩ কোটি ৬০ লাখের কিছু বেশি। নির্বাচনে মোট ১ হাজার ১৭১টি জাতীয়, রাজ্য ও আঞ্চলিক আসনে ৯০টি দলের ৫ হাজার ৬৪৩ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটগ্রহণের জন্য সারা দেশে ৫০ হাজার ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। দেশটির উচ্চকক্ষে আসন সংখ্যা ২২৪টি এবং নিম্নকক্ষে রয়েছে ৪৪০টি আসন। এবারও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করেই নির্বাচনে করছে সু চির দল এনডিএ।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলে আসছে। ২০১৫ সালে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করে সু চি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ সংকট তীব্র হতে শুরু করে। ২০১৬ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে। তখন অনেক রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে পুরো রাখাইন রাজ্যজুড়ে চরম নির্যাতন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এ সময় রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, হত্যা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। মানবিক বিবেচনায় তাদের কক্সবাজারে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ সরকার। সারা বিশ্ব থেকে নিন্দার ঝড় উঠলেও আমলে নেয়নি সু চি প্রশাসন। প্রতিবাদে অনেক সংস্থা ও সংগঠন সু চিকে দেওয়া সম্মাননা প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এই জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমার সরকার ও তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা চলছে।
দুই মুসলিম প্রার্থী জয়ী : এবারের নির্বাচনে এনএলডির দুই মুসলিম প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তারা হলেন ইউ সিথু মাউং এবং ডাউ উইং মায়া মায়া। মিয়ানমার টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাউং তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ১২ হাজার ৮৮২ ভোটে এবং মায়া তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে বিপুল ভোটে এগিয়ে আছেন।