রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড হাসপাতালে গত সোমবার মারা যাওয়া মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমকে তার স্বজনরাই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছেন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগীকে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিলে রোগীর লোকজন ভর্তি না করিয়ে মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর কিছু সময়ের মধ্যেই ওই পুলিশ কর্মকর্তা মারা যান।
জাতীয় মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসকরা মনে করছেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তা ভায়োলেন্ট বা অস্থির ধরনের মানসিক রোগী ছিলেন। মাইন্ড এইড হাসপাতালে তাকে শান্ত করার জন্য যে ধরনের ভায়োলেন্ট রুম ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তা অবৈজ্ঞানিক ও ভুল পদ্ধতি। এ ধরনের রোগীদের ‘ফিজিক্যাল রিস্ট্রেন্থ’-এর মাধ্যমে শান্ত করার বিশেষ পদ্ধতি আছে, যা যথোপযুক্ত ছিল না।
এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে। সে কমিটি দেখবে হাসপাতালের চিকিৎসকদের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না।
এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোগীর স্বজনদের ইচ্ছেতেই রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রোগী এসেছেন জরুরি বিভাগে। আমাদের নিয়ম হচ্ছে জরুরি বিভাগে কোনো রোগী এলে যাকে পর্যবেক্ষণ দরকার তাকে রেখে পর্যবেক্ষণ করি। পরে ভর্তি করার দরকার হলে তাকে ভর্তি করানো হয়। আর যার জরুরি চিকিৎসা দরকার, তাকে সে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিই। এটা হচ্ছে আমাদের প্রক্রিয়া। উনি যখন এসেছেন, তখন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে দেখেছেন। উনি খুব অস্থির ছিলেন। তখন তাকে ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং উনি শান্ত হয়েছেন অনেকটা। পরে আমাদের আবাসিক চিকিৎসক (আরপি বা রেসিডেন্সিয়াল ফিজিশিয়ান) পার্টিকে (রোগীর লোকজনদের) বলেছেন, উনি পর্যবেক্ষণে আছেন। জরুরি বিভাগ চালু হলে তাকে ভর্তি করানো হবে। কিন্তু রোগীর লোকজন রোগীকে আমাদের হাসপাতালে রাখতে আগ্রহী হননি। তারা বলেছেন, রোগীকে তারা ভর্তি করাবেন না এবং এটা আমাদের নিশ্চিত করেছেন। আমাদের আরপি কিন্তু লিখে দিয়েছেন যে, আমরা ওনাকে ভর্তি করাতে বলেছিলাম, কিন্তু উনারা ভর্তি করাতে রাজি হননি। সেটা আরপি কাগজে লিখে দিয়েছেন। তারপর উনারা চলে গেছেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল একটা কমিটি করেছে বলে জানান পরিচালক। তিনি বলেন, তিন সদস্যের এই কমিটি তদন্ত করে দেখবে, হাসপাতালের কোনো গাফিলতি ছিল কি না। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে ডা. অভ্র দাস ভৌমিককে। উনি ফরেনসিক ও কমিউনিটি সাইকিয়াট্রিক বিভাগের দায়িত্বে আছেন। আমরা তদন্ত করছি আমাদের জন্য। আমরা দেখতে চাই আমাদের নিজেদের কোনো গাফিলতি আছে কি না। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের কোনো তদন্ত করার নির্দেশ দেয়নি। আমরা করেছি নিজেদের জন্য। আমরা তাদের ভর্তি করাতে বলেছি। তারা ভর্তি করাননি।
এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিকুল আলম সুমন গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওরা (মাইন্ড এইড হাসপাতাল) যেভাবে রোগীর ব্যবস্থাপনা করেছে, সেটা বৈজ্ঞানিকভাবে করতে পারেনি। ওদের উদ্দেশ্য যত পরিষ্কারই থাক, ওদের যে রুম (ভায়োলেন্ট রুম), সেটা কিছুতেই ভায়োলেন্ট রুম বলে না।
এই চিকিৎসক বলেন, রোগীর ভগ্নিপতি ও বোন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। রোগী পরশুদিন (গত সোমবার) সকাল ৭টায় আমাদের হাসপাতালে এসেছেন। আমাদের এখানে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগ। এ ছাড়া বাকি সময় জরুরি বিভাগ। ওই রোগীকে আমাদের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা দেখেছেন। ইনজেকশন দিয়ে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের নিয়ম হচ্ছে বহির্বিভাগ চালু হওয়ার আগে রোগী এলে ও তার যদি ভর্তি হওয়ার দরকার হয়, তাহলে তাকে পর্যবেক্ষণে রেখে দিই। আউটডোর চালু হলে তখন আবাসিক চিকিৎসকের মাধ্যমে ভর্তি শুরু হয়। আমরা ওই রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখি। এর মধ্যে রোগীর লোকজন আবার আবাসিক চিকিৎসকের কাছে গেছেন। আমাদের ডাক্তার আবার রোগী দেখেছেন। কিছু ওষুধ রদবদল করে দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে রোগীকে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন। সেভাবে প্রেসক্রিপশন করেছেন। কিন্তু কেন কী কারণে তারা রোগী নিয়ে গেল, আমরা জানি না। তারা বলেছেন, এই পরিবেশে তারা এখানে রোগী ভর্তি করাবেন না। নিজেরাই রোগী নিয়ে চলে গেছেন। তারা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিয়ে গেছেন। তারা নিজেরাও বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যে, তারা নিজেরাই রোগী নিয়ে গেছেন। তবে তাদের উচিত ছিল পরিবেশ বা চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে পরিচালক বা অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলা। সেটা করেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানকার যে আরপি, উনি রোগীর ভগ্নিপতির মেডিকেলের সহপাঠী। ফলে ওই রোগীর প্রতি এখানকার ডাক্তাররা যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। এখানে এক কেবিনে দুই রোগী। মাত্র দুইটা কেবিন। একজন রোগী কেবিনে ভর্তি হলে তার রিলিজ পেতে সময় লাগে এক মাস। তখন আমরা রোগীকে ওয়ার্ডে রাখি। পরে তাকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কেবিনে নিই। এখানে এক ওয়ার্ডে আট রোগী। আমরা তো এই পরিবেশেই চিকিৎসা করছি। চাইলেই তো পরিবেশ বদলাতে পারব না।
এ ব্যাপারে ডা. তারিকুল আলম সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রোগীর চিকিৎসা বা ভর্তির ব্যাপারে আমাদের কোনো ধরনের অবহেলা ছিল না। এটা তারাও বলতে পারবেন না বলে আমাদের বিশ্বাস যে তারা আমাদের কোনো ধরনের সহযোগিতা পাননি। ভগ্নিপতি একজন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ডাক্তার। তারা খোঁজখবর নিয়েই রোগীকে এখান থেকে নিয়ে গেছেন।
উল্লেখ্য, গত সোমবার সকালে ভর্তির পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাইন্ড এইড হাসপাতালে মারা যান এই পুলিশ কর্মকর্তা। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হাসপাতালের ব্যবস্থাপকসহ ছয়জনকে আটক করেছে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের দাবি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করায় তারা পুলিশ কর্মকর্তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।