অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুল, তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সেলিনা ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গতকাল বুধবার দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বাদী হয়ে কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলাটি করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন পাপুলের শ্যালিকা জেসমিন প্রধান ও মেয়ে কাজী ওয়াফা ইসলাম।
গতকাল ঢাকার নিজ কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘শুধু কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুল নয়, আরও কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী তদন্তে বিদেশে পাপুলের সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে তাকে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ (গতকাল) দুজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সাবেক ও বর্তমান মিলে আরও ২১ এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। শিগগিরই এদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে।’
মামলায় বলা হয়েছে, জেসমিন প্রধান প্রতারণার মাধ্যমে নিজের জন্মতারিখের তথ্য গোপন করেন। তিনি ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে পাসপোর্ট এবং নিজ নামে অপরাধলব্ধ ২ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অস্থাবর সম্পদের মালিক হন, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একইসঙ্গে জেসমিন প্রধানের ভগ্নিপতি শহীদুল ইসলাম পাপুল, বোন সেলিনা ইসলাম ও বোনের মেয়ে কাজী ওয়াফা ইসলাম অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে জমা রাখেন। এসব এফডিআরের বিপরীতে জেসমিন প্রধানের ব্যাংক হিসাবের অনুকূলে ২৫ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা লোন এগেইনস্ট এফডিআরের (ওভার ড্রাফটট) সুবিধা দেন। পরস্পর যোগসাজশে আসামিরা বিভিন্ন ব্যাংকে জেসমিন প্রধানের নামে ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ২০১২ সালের ২ জুন থেকে ২০২০ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত জেসমিন প্রধানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ২ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৭ টাকাসহ মোট ১৪৮ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬১ টাকা জমা করা হয়। পরে অবস্থান গোপনের মাধ্যমে এই হিসাব থেকে ১৪৮ কোটি ২১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৮ টাকা তুলে নেওয়া হয়, যা এমপি পাপুল-সেলিনা দম্পতি পাচার করেছেন।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, গত ৬ জুন এমপি পাপুল কুয়েতে গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি দেশটির কারাগারে আছেন। পাপুল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মারাফিয়া কুয়েতিয়ার চেয়ারম্যান। ইতিমধ্যে কুয়েত সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত এবং অবৈধ লেনদেন ও মানবপাচারের অভিযোগে ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করেছে। বাংলাদেশে পাপুল পরিবারের ৫৮৮টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পেয়েছে দুদক, যাতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা।
অর্থপাচারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আসার পর এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পাপুল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুসন্ধানে নামে দুদক। ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ ওঠায় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটিতে পাপুলের নামে ২ কোটি ২১ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। স্ত্রীর নামেও এই ব্যাংকে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। সবমিলে ব্যাংকটিতে এ দম্পতির বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। দুদক গত ১৭ জুন পাপুল, সেলিনা, কাজী ওয়াফা ও জেসমিনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আর পাপুল ঘনিষ্ঠ লক্ষ্মীপুরের জামশেদ কবীর বাকি বিল্লাহ, নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন, সালাহউদ্দিন টিপু ও আরিফের সম্পদের হিসাব নিতে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে দুদক। অর্থ পাচারসহ পাপুল দম্পতির বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা।