সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে এখনো মনোরোগী বলতে ‘পাগল’ আর মনোরোগের চিকিৎসা বলতে ‘পাগলের চিকিৎসা’ মনে করা হয়। কিন্তু মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়া মানেই পাগল হয়ে যাওয়া নয়, পাগলামি করা বা পাগল হয়ে যাওয়া মনোরোগের সর্বশেষ পর্যায় যখন মানুষ সব ধরনের হিতাহিত জ্ঞান বা যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে। মনোরোগ বিষয়ে এমন অজ্ঞানতার নেপথ্যে কেবল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই নয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতাও দায়ী। কেননা সাধারণভাবে স্বাস্থ্য বলতে আমরা শারীরিক সুস্থতার কথা বুঝলেও স্বাস্থ্য বলতে প্রকৃত অর্থে শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যকেই বোঝায়। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাসেবার সুযোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় বলা হচ্ছে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো পর্যায়ের মানসিক রোগে ভুগছেন। অর্থাৎ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৭৬ লাখ হলে দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষই মানসিক ব্যধিতে আক্রান্ত।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসাসেবা যৎকিঞ্চিৎ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে মনোচিকিৎসার অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোনো না কোনো পর্যায়ের মনোরোগে আক্রান্ত প্রায় তিন কোটি মানুষের জন্য দেশে মাত্র দুটি সরকারি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল রয়েছে। ১০ লাখ মানুষের সেবায় মাত্র পাঁচজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২৬০ জন। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি হিসেবে দেশে প্রতি এক কোটি মানুষের মানসিক চিকিৎসায় চিকিৎসক মাত্র ১৩ জন। আর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন ৫০ জন, যা এক কোটি মানুষের জন্য তিনজন। এমনকি রাজধানীতে অনুমোদিত বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের সংখ্যা মাত্র ১৫টি। সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৫টি মেডিকেল কলেজে মানসিক রোগের বিভাগ আছে। অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনা থেকে যেমন মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয় তেমনি মনোরোগেও আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতাও মনোরোগ বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এসব বিবেচনায় নিলে জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রতি ছয়জনে একজন নাগরিকের কোনো না কোনো পর্যায়ের মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরিসংখ্যানকে অবশ্যই খুবই নাজুক পরিস্থিতি হিসেবে আমলে নেওয়া জরুরি।
মনোচিকিৎসার অপ্রতুলতার পাশাপাশি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে গতানুগতিক চিকিৎসাপদ্ধতি। একদিকে যেমন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারের প্রচ- অভাব; তেমনি এখনো দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা চলছে গতানুগতিক পদ্ধতিতে। বিশেষ করে সিরিয়াস ধরনের ‘ভায়োলেন্ট পেশেন্ট’ বা অস্থির রোগীদের শান্ত করা হচ্ছে হাত-পা বেঁধে ও জোরজবরদস্তি করে অবৈজ্ঞানিক ভায়োলেন্ট রুমে। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে শারীরিক নির্যাতন। এতে রোগীদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর একটি তথাকথিত মানসিক হাসপাতালে পুলিশের এএসপি আনিসুল করিম শিপনের মৃত্যুর জন্য এই অবৈজ্ঞানিক ভায়োলেন্ট রুমে জোরজবরদস্তি করে হাত-পা বাঁধা ও শান্ত করতে নির্যাতনকে দায়ী করা হচ্ছে। মানসিক রোগের চিকিৎসায় দেশের এতটা পিছিয়ে থাকার পেছনে যেমন সরকারি- বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মনোরোগের চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা দায়ী তেমনি মনোরোগ সংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও দায়ী। বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন দেশে যত মানসিক রোগী আছে, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ রোগীই মানসিক রোগের চিকিৎসা পান না, মোট রোগীর মাত্র ১০ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন। এর দুটি কারণের একটি হলো অনেক মানসিক রোগী বুঝতেই পারেন না তিনি মানসিক রোগী এবং তার চিকিৎসা দরকার। আরেকটা কারণ হলো স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার এই দুর্দশার মধ্যে বাড়তি সংকট তৈরি করেছে মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে যেনতেন প্রকারে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে গজিয়ে ওঠা শত শত মাদক নিরাময় কেন্দ্র। যেকোনো ধরনের হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনা করে চিকিৎসা দিতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে হাসপাতালের লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়ে এমন বহু নিরাময় কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই ভুল-ভাল চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড নামে তথাকথিত যে হাসপাতালে শারীরিক নির্যাতনে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল মারা গেলেন সেটি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্স প্রাপ্ত নয়। দেশে বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে অব্যাহতভাবে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মাদকাসক্তি নিরাময়ের বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মনোচিকিৎসা ও মাদকাসক্তি নিরাময়ের চিকিৎসার বিষয়টি তাই সরকারের নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।