ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদ হোসেন বরকত এবং তার ভাই প্রেস ক্লাবের অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি ইমতিয়াজ হোসেন রুবেলের বিরুদ্ধে আলাদা দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের বিরুদ্ধে মোট ৭২ কোটি ৮৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আলী আকবর বাদী হয়ে দুদক সজেকা ঢাকা-১-এ দুদক ও আইন অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলাগুলো করেন। এর আগে গত ২৬ জুন বরকত ও রুবেলের বিরুদ্ধে ২ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে অর্থ পাচার আইনে মামলা করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলাটির তদন্তও করছে সিআইডি।
২০১৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই ফরিদপুর শহর যুবলীগের সভাপতি হন বরকত। এছাড়া তিনি জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতিও হন। এরপর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, দখলবাজি ও জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েন। বরকাতের ভাই রুবেল সাংবাদিকতার কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি হন এবং একটি পত্রিকার ডিক্লারেশনও নেন। ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন রুবেল আর প্রকাশক বরকত। এছাড়া ফরিদপুরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও তারা কব্জায় নিয়ে নানা দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হন।
দুদকের করা একটি মামলায় সাজ্জাদ হোসেন বরকতকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, বরকত অবৈধ উপায়ে অর্জিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ দিয়ে ৪৪ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩২ টাকা মূল্যের সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন। তিনি দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫২ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেন। দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য দেন। যা দুদক আইন ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্য মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বরকতের ভাই রুবেল অবৈধ উপায়ে অর্জিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ দিয়ে ২৮ কোটি ৩৫ লাখ ১০ হাজার ১৭০ টাকা মূল্যের সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন। তিনি কমিশনে দখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মোট ১৭ কোটি ৯০ লাখ ৩ হাজার ১৪১ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তিনি দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। যা দুদক আইন ও অর্থ পাচার আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলার মামলায় বরকত ও রুবেলকে গত ৭ জুন গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের আরও ১৯ জন নেতাকর্মীকে।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ফরিদপুরের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পুঁজি করে ২ হাজার কোটি টাকা আয় করেন বরকত ও রুবেল। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সন্ত্রাস, জমি দখল, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াতেন তারা। বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও জমি দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। যাকে খুশি তাকে মারধর ও লাঞ্ছিত করতেন এ দুই ভাই। তাদের আক্রোশের শিকার হয়ে অনেকে ফরিদপুর শহর থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যান।
ফরিদপুরের বাইরে খুলনা, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাগুরা, পটুয়াখালী, শেরপুর, সিলেট, গাজীপুর ও দিনাজপুরেও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের। গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তারা।
গত ২৬ জুন সিআইডির পরিদর্শক এসএম মিরাজ আল মাহমুদ বাদী হয়ে ঢাকার কাফরুল থানায় বরকত ও রুবেলের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার আইনে মামলা করেন। ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ফরিদপুরের এলজিইডি, বিআরটিএ ও সড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বরকত ও রুবেল। এছাড়া মাদক কারবার ও ভূমি দখল করে অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। ২৩টি বাস ও ট্রাকসহ বিলাসবহুল গাড়ির মালিক হয়েছেন। এজাহারে আরও বলা হয়, রাজবাড়ীতে ১৯৯৪ সালের ২০ নভেম্বর এক আইনজীবী খুন হন। ওই হত্যা মামলার আসামি ছিলেন বরকত ও রুবেল। মিরাজ আল মাহমুদ মামলাটির তদন্ত করছেন। আলোচিত এ দুই ভাই অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।