সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনায় যেমন শেষ হয়ে যাচ্ছে রেশমা নাহার রত্নার মতো পর্বতারোহীর এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন, তেমনি কঠোর জীবন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারুণ্য অতিক্রম করা রাজীব হোসেনের স্বপ্নরথও থেমে গেছে দুটি বাসরূপী যন্ত্রদানবের প্রতিযোগিতায়। এ রকম দেশের অসংখ্য আবালবৃদ্ধবনিতার জীবন হারিয়ে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। গত বৃহস্পতিবার যশোরের শার্শায় স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে সামিয়া ইসলাম নামে এক কিশোরীর স্বপ্নও এভাবে মহাসড়কের কালো পিচে চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়ার হৃদয়বিদারক খবর মিলেছে। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের জন্য নির্ধারিত অ্যাসাইনমেন্টের খাতা জমা দিতে যাওয়ার সময় ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিয়েছে এই কিশোরীর জীবন। একই সঙ্গে নিহত হয়েছেন সামিয়াসহ তিন শিক্ষার্থীকে বহনকারী ভ্যানচালকও।
গত ১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েল হত্যা মামলার রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। এই মামলার রায়ে বলা হয়, প্রতিটি সড়ক যেন হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। সড়কে দুর্ঘটনা তো ঘটছেই, মারা যাচ্ছে সব বয়সী মানুষ। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীও রেহাই পাচ্ছে না বেপরোয়া বাসচালকদের হাত থেকে। সড়ক এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। দিনে দিনে সড়কে দীর্ঘায়িত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। কোনোভাবেই এই মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রকৃত অর্থেই দেশের সড়ক দুর্ঘটনার বাস্তব চিত্র এই রায়ের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন হলো, আর কত প্রাণের বিনিময়ে কর্র্তৃপক্ষের টনক নড়বে আর রাশ টেনে ধরা যাবে এই সড়ক দুর্ঘটনা নামক মরণফাঁদের?
২০১৮ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের স্মৃতি এখনো খুব একটা পুরনো হয়ে যায়নি। লাগাতার কয়েক দিন ধরে চলতে থাকা শান্তিপূর্ণ ওই আন্দোলন ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথের চিত্র পাল্টে দিয়েছিল। স্কুলের পোশাক পরিহিত কোমলমতি কিশোর-কিশোরীরা সকাল-সন্ধ্যা যেভাবে সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়েছে, দেশবাসীর তা অনেক দিন মনে থাকবে। কিশোর-কিশোরীদের সেই আন্দোলন এবং আবরারের মৃত্যুতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন একটা বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। সেটা নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার। নিরাপদ সড়ক বা কেবল সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবিই নয়, এই প্রজন্ম যে পুরো দেশকেই একটা শৃঙ্খলার মধ্যে দেখতে চায় এবং প্রয়োজনে সে জন্য তারা আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত, তাদের আন্দোলনের স্লোগান আর দাবি-দাওয়ার ভাষা পড়লেই সেটা বোঝা যায়। কিন্তু তাদের এই অঙ্গীকার পূরণে যদি সামান্যতম সাড়া দেওয়া যেত, তাহলে সামিয়াদের মতো কিশোরীরা এভাবে আর মহাসড়কে প্রাণ হারাত না।
জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে যারা অঙ্গীকার করেছে যে ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে কাজ করবে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে গঠন করা হয়েছে ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন’। কিন্তু তারপরও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ৩২ লাখ রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত গাড়ির বিপরীতে অবৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। দেশের বিভিন্ন সড়কে ২৬০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আজও সরলীকরণ হয়নি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। সরকারি হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অবশ্য যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এই সংখ্যা আট হাজার। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে যানবাহনের অতিরিক্ত গতির কারণে। আর ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য তিনটি কারণকে দায়ী করেছেনওভারস্পিড, ওভারটেকিং এবং যানবাহন ও রাস্তার ত্রুটি।
এআরআইর এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটছে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে। এ জন্য কাঠামোগত ত্রুটি দূর করার পাশাপাশি মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি। সড়ক-মহাসড়কে সিসিক্যামেরা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং তথ্যসহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ‘ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’ নামে যে প্রকল্পের কাজ করছে, তার দ্রুত বাস্তবায়ন সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া সড়ক-মহাসড়ক তৈরির ১০০ বা ২০০ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনা থাকা দরকার; যাতে কেউ সেই সব স্থানে আগে থেকে বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করতে না পারে। আবার মাটির রাস্তার পাশেও যেন থাকে প্রশস্ত ফুটপাত। মৃত্যুর মিছিল হ্রাস করতে সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের দৃষ্টান্ত রয়েছে। থাইল্যান্ড ২০১১ সালে ঘোষণা করেছিল, তারা ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনবে এবং ইতিমধ্যে এ কাজে তারা সফল হয়েছে। তাহলে আমরা পারছি না কেন?