দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি ৯ জনের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ সংখ্যা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে আরও বেশি, অর্থাৎ দেশের প্রতি ৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে ভুগছেন। শুধু রোগীর সংখ্যাই নয়, ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হারও দেশে বেশি।
এমনকি বিশ্বের যে তিনটি দেশে বর্তমানে সবচেয়ে উচ্চহারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তার মধ্যে একটি বাংলাদেশ এবং অন্য দুটি ভারত ও চীন। একই সঙ্গে বর্তমানে (সর্বশেষ ২০১৯ সালের জরিপ) বিশ্বের শীর্ষ ১০ ডায়াবেটিস উচ্চহার দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে হারে ডায়াবেটিস রোগ বাড়ছে, তাতে আগামী ২০৩০-২০৪৫ সালের মধ্যে শীর্ষ দেশের তালিকায় নবমে উঠে আসবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের যৌথ সমীক্ষা, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য থেকে ডায়াবেটিসের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
এ অবস্থার মধ্য দিয়েই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়-‘ডায়াবেটিস-সেবায় পার্থক্য আনতে পারেন নার্সরাই’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
ডায়বেটিস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়বেটিসে আক্রান্তরা নানা ধরনের জটিলতায় ভুগে থাকেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পরও অনেকের মধ্যে ডায়াবেটিসের বেশিভাগ উপসর্গ দেখা যায়। কভিডে আক্রান্ত রোগীর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতাগুলোর মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। ডায়াবেটিস রোগীর যেকোনো সংক্রমণ হলে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। ফলে রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধি পায় ও স্নায়ুবিক নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। একইভাবে সংক্রমণের জটিলতার কারণে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে আক্রান্তদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, তেমনি কভিড-১৯ জনিত জটিলতার হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সুগার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কভিড-১৯ জনিত জটিলতা কয়েক গুণ যেমন বেড়ে যায়, সেই সঙ্গে এদের মৃত্যুঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যে হারে ডায়াবেটিস রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে আগামীতে বাংলাদেশ উচ্চ ডায়াবেটিস দেশের তালিকার আরও উপরে উঠে যাবে। তাই এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে ডায়াবেটিসের হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যেটিকে প্রতিরোধ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কিন্তু একবার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে বাকি জীবন ডায়াবেটিস নিয়েই কাটাতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস চিকিৎসা যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সর্বাত্মক সুগভীর কর্মকা-। রাষ্ট্রকেই ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে এ কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে, সব ধরনের মানুষকে যুক্ত করতে হবে। পাঠ্যসূচি থেকে শুরু করে নগর পরিকল্পনা, বিদ্যালয় স্থাপনসহ সব ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধসহ মেটাবলিক রোগগুলো নিয়ন্ত্রণের কাঠামোগত উন্নতি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক (২০-৮০ বছর) মানুষদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৫ লাখ। সে হিসাবে প্রতি ৯ জনের মধ্যে একজন ডায়বেটিসে আক্রান্ত। সমসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির (প্রি-ডায়াবেটিস) মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রতি ৫ জন প্রাপ্ত-বয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে ২৬ জন গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা বিশেষ করে পক্ষাঘাত, হৃদরোগ, পায়ে পচনশীল ক্ষত, অন্ধত্ব ও কিডনিসংক্রান্ত জটিলতার হারও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে প্রতি ১০০ জন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে ৬০ জন ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় আক্রান্ত। শুধু ২০ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, বর্তমানে দেশের মোট রোগীর ৬০ শতাংশ ডায়াবেটিক সমিতির ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত সেবাকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে সেবা নিয়ে থাকেন। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেও বেশকিছু রোগী সেবা নিয়ে থাকে। ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের কাজটা খুব সহজ নয়। তা ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার পদ্ধতিও বেশ ব্যয়বহুল। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, রক্ত পরীক্ষা করা, ওষুধ খাওয়া, কারও কারও ক্ষেত্রে নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়া ছাড়াও ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা দেখার জন্য মাঝেমধ্যে নানা ধরনের পরীক্ষারও দরকার হয়। অথচ আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের অনেকের এমনকি চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর মতো অর্থও নেই। তাই সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে ইনসুলিনসহ ডায়াবেটিস চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
কর্মসূচি : দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিসহ নানা সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। সমিতির কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑ রোড শো, সকাল ৮টা থেকে ১১টা, রমনা পার্কের গেটের পাশে এবং এনএইচএন ও বিআইএইচএসের বিভিন্ন কেন্দ্র সংলগ্ন স্থানে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়, সকাল সাড়ে ১০টায় বারডেমে আলোচনা সভা ইত্যাদি।